বুধবার, ২০শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং

৩য় ও ৪র্থ পর্যায়ে করোনা ভ্যাকসিন পাবেন যারা

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশের সব মানুষের জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের অ্যাস্ট্রেজেনেকা ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভ্যাকসিন সংগ্রহ ছাড়াও ভ্যাকসিন বিতরণের পরিকল্পনারও একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সেই খসড়া অনুযায়ী চার ধাপে ভ্যাকসিন বিতরণ করে দেশের ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই খসড়া এরই মধ্যে পাঠানো হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র বলছে, প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে তিন ধাপে ২০ শতাংশ জনসংখ্যা অর্থাৎ তিন কোটি ৪৫ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৭ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এরপর তৃতীয় পর্যায়ে দেশের এক কোটি ২০ লাখ ৯ হাজার ৬৫৭ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। আর চতুর্থ ও শেষ পর্যায়ে আরও ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ছয় কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৪ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হতে পারে। এই ধাপে অগ্রগণ্য হবেন শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, অন্তঃসত্ত্বা নারী (যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিরাপদ ঘোষিত হয়), অন্যান্য সরকারি কর্মচারীসহ বস্তিবাসী। চতুর্থ ও শেষ পর্যায়ে জনসংখ্যার বাকি যে ৪০ শতাংশকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তাদের মধ্যে রয়েছে শিশু-কিশোর, স্কুলগামী ছাত্রছাত্রী ও অন্যরা।
তৃতীয় পর্যায়ে যারা করোনার ভ্যাকসিন পেতে পারে

১- দেশে তৃতীয় পর্যায়ের শুরুতেই করোনার ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন প্রাথমিক স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, মাদরাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা, যারা বয়স দিক বিবেচনায় প্রথম পর্যায় ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ভ্যাকসিন পাননি। এ ক্ষেত্রে ছয় লাখ ৬৭ হাজার ২০৪ জন ভ্যাকসিনর আওতায় আসতে পারেন খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী।

২- খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী তৃতীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিরাপদ ঘোষিত হলে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। এক্ষেত্রে তিন লাখ ৮১ হাজার ২০১ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে।

৩- সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের যারা প্রথম দুই পর্যায়ে ভ্যাকসিন পাননি, তারা এই পর্যায়ের ভ্যাকসিনর আওতায় আসবেন। এ পর্যায়ে ১২ লাখ ১৭ হাজার ৬২ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

৪- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যারা প্রথম পর্যায়ে ভ্যাকসিন পাননি, তারা এই পর্যায়ে ভ্যাকসিনর আওতায় আসবেন। সেক্ষেত্রে ৪৩ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে এই ধাপে।

৫- সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার যেসব কর্মী প্রথম দুই পর্যায়ে ভ্যাকসিন পাননি, তারা এই ধাপে ভ্যাকসিন পাবেন। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের আওতায় আসবেন ছয় লাখ জনসংখ্যা।
বিজ্ঞাপন

৬- দেশের বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যারা বয়স বিবেচনায় প্রথম দুই পর্যায়ে বাদ পড়বেন, তারা এই ধাপে ভ্যাকসিন পাবেন। এক্ষেত্রে ২২ লাখ জনসংখ্যাকে ভ্যাকসিনর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

৭- রফতানি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ২০ লাখ ৮১ হাজার ৮৮৪ জন কর্মী এই পর্যায়ে ভ্যাকসিনর আওতায় আসতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে খসড়া পরিকল্পনায়।
বিজ্ঞাপন

৮- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীরা এই পর্যায়ে ভ্যাকসিনর আওতায় আসবেন। সর্বমোট ২৫ লাখ কর্মীদের ভ্যাকসিন দেওয়া হতে পারে এই ধাপে।

৯- দেশের বিভিন্ন কারাগারে থাকা কয়েদি ও কারাগারের কর্মচারীরা এই পর্যায়ে ভ্যাকসিনর আওতায় আসতে পারেন। ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৮৮ হাজার ৮৪ জন কয়েদি ও ৯ হাজার ১৬১ জন কর্মচারী আছে কারাগারে। সব মিলিয়ে ৯৭ হাজার ২৪৫ জনকে এই পর্যায়ে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।

১০- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে শহরের বস্তিবাসী ও ভাসমান জনগোষ্ঠীকে এই পর্যায়ে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এই পর্যায়ে সর্বমোট ২২ লাখ ৩২ হাজার ১১৪ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হতে পারে বলে খসড়া পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

১১- দেশের কৃষি ও খাদ্য সরবরাহের কাজে নিয়োজিত ১৬ লাখ ৫০ হাজার জনকে এই পর্যায়ে ভ্যাকসিনর আওতায় আনা হতে পারে বলে খসড়া পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

১২- বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত পাঁচ লাখ নাগরিককে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে এ পর্যায়ে।

১৩- দুই লাখ গৃহহীন জনগোষ্ঠীকে এই পর্যায়ে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।

১৪- পোশাক শিল্প বাদে দেশের অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যারা বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় কাজ করেন, তাদের এই পর্যায়ে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিন পেতে পারেন ৫১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৪৪ জন।

১৫- দ্বিতীয় পর্যায়ে গণপরিবহনের যেসব কর্মী ভ্যাকসিন পাননি, তারা এ পর্যায়ে ভ্যাকসিন পাবেন। মোট তিন লাখ জনসংখ্যাকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

১৬- ৫০ থেকে ৫৪ বছর বয়সী যারা দ্বিতীয় পর্যায়ে বয়স বিবেচনা বা কর্মক্ষেত্র বিবেচনায় ভ্যাকসিন পাননি, তাদের এই পর্যায়ে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। মোট ৬৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩২৩ জন ভ্যাকসিন পেতে পারেন এ পর্যায়ে।

এছাড়াও খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী এই পর্যায়ে দেশে যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য পাঁচ লাখ ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করা হবে।

চতুর্থ পর্যায়ে যারা করোনার ভ্যাকসিন পেতে পারে

১- এ পর্যায়ে দেশের তিন কোটি ২২ লাখ ৩৪ হাজার তরুণকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে।

২- তিন কোটি ৬০ লাখ ৪৭ হাজার ১৫৭ জন স্কুলগামী ছাত্রছাত্রী ও শিশুদের এই পর্যায়ে ভ্যাকসিনর আওতায় আনা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে খসড়া পরিকল্পনায়।

৩- এর আগে কোনো পর্যায়েই যারা করোনার ভ্যাকসিন পাননি, তেমন ৮ লাখ ৪২ হাজার ৫৯৭ জনকে এ পর্যায়ে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটির অন্যতম সদস্য এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) কার্যকরী সদস্য ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘এরই মধ্যে জাতীয়ভাবে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন বিতরণ ও প্রস্তুতি পরিকল্পনা বিষয়ে একটি প্রাথমিক খসড়া শেষ করা হয়েছে। খসড়া পরিকল্পনা অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে।’

তিনি বলেন, করোনার ভ্যাকসিনদান কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গঠিত কিছু কমিটি কাজ শুরু করেছে। এই কমিটির অন্যতম কাজই হবে ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার জনগোষ্ঠীর তালিকা তৈরি করা।

ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ভ্যাকসিন আসার বিষয়টি কনফার্ম হলে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও তালিকা করা হবে। এক্ষেত্রে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি, তাদের রেজিস্ট্রশন করানো হবে। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধন কার্ড দেখে বয়স অনুযায়ী এই কাজে সাহায্য করবেন। শহরের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার কর্মীরা এ কাজে সাহায্য করবেন। আগে থেকে তালিকা করলে কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। তাই যখন নিশ্চিত হওয়া যাবে তখন এই কাজ শুরু করা হবে। রোহিঙ্গাদের ভ্যাকসিনদানের বিষয়ে সরকার দাতাসংস্থার কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া হতে পারে বলে জানান তিনি।

এরই মধ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রিটিশ-সুইডিশ ওষুধ নির্মাতা অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত তিন কোটি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ক্রয়চুক্তি সই করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মাধ্যমে এই ভ্যাকসিন নিয়ে আসছে বাংলাদেশ সরকার। প্রত্যেককে এই ভ্যাকসিনের দু’টি করে ডোজ নিতে হবে। প্রথম ডোজ নেওয়ার ২৮ দিন পর নিতে হবে দ্বিতীয় ডোজ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে শুরু করে পরবর্তী ছয় মাসে ৫০ লাখ করে মোট তিন কোটি ভ্যাকসিন পাওয়া আশা করছে বাংলাদেশ। আর এজন্য নেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের প্রস্তুতি। দেশে ভ্যাকসিন আনা, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও নেওয়া হচ্ছে নানারকম পদক্ষেপ। সরকারের কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট টাস্কফোর্স ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মনিটরিং কমিটি গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা মেনে ভ্যাকসিন বিতরণ বিষয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ নেই। এছাড়াও ভ্যাকসিন দেশে আনার পর সংরক্ষণ থেকে শুরু করে বিতরণের আগ পর্যন্ত যত ধরনের প্রস্তুতিমূলক কাজ আছে, সেগুলো নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। যাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা এফডিএ’র অনুমোদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা দ্রুত ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে বিতরণ করতে পারি।

দেশে ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় পর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র। এর মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে উপদেষ্টা করে গঠন করা হয়েছে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা ওয়ার্কিং গ্রুপ। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরার নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটি।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত