সোমবার, ২৫শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং

‘অপরাধী যেই হোক তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে’

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যে দলের হোক, যে কেউ হোক- অপরাধী অপরাধীই। কাজেই অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে সমাজটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৬ নভেম্বর) দুপুরে ১১৬, ১১৭ এবং ১১৮তম আইন ও প্রশাসন প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে শাহবাগ বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন। গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিসিএস প্রশাসন একাডেমি প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর বদরুন নেছা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ১১৬, ১১৭ ও ১১৮তম কোর্সে অংশ নেওয়া প্রশিক্ষণার্থীদের পক্ষ থেকে তিনজন অনুভূতি ব্যক্ত করেন। অংশগ্রহণকারী মোট ১১৬ জন প্রশিক্ষণার্থী সবাই সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এছাড়া তিনজন প্রশিক্ষণার্থী রেক্টর অ্যাওয়ার্ডস লাভ করেন। এরা হলেন- জিসান বিন মাজেদ, হাফিজুল হক এবং তারিকুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী রেক্টর অ্যাওয়ার্ডস তুলে দেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে পাকিস্তান আমলে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। এছাড়া জাতির পিতার নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আন্দোলনের বিভিন্ন পটভূমিও তুলে ধরেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা জাতির পিতার আদর্শ নিয়েই রাজনীতি করি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং আমাদের যে রিসার্চ সেল আছে- আমরা সবসময় বাংলাদেশকে কীভাবে জাতির পিতার আদর্শে গড়ে তুলব সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের দীর্ঘ ২১ বছর পর আমরা সরকার গঠন করি। সরকার গঠনের পর থেকে আমরা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিই। এছাড়া পরবর্তী সময়ে টানা মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশটাকে আমরা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। গড়ে তুলতে চাই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ; যে বাংলাদেশে প্রত্যেক মানুষ সম্মানের সাথে বসবাস করবে। আমরা চাই, সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে সম্মান নিয়ে চলবে। কারণ জাতির পিতা বলেছিলেন, ভিক্ষুক জাতির কোনো ইজ্জত থাকে না। আমরা কিন্তু সর্বত্র চেষ্টা করেছি। এবারও আমরা বড় বাজেট দিয়েছি। আমরা চেষ্টা করেছি, কারও কাছে হাত পেতে নয়, নিজেরা চলব।’

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে আগামী দিনে খাদ্যাভাবের কথা চিন্তা করে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে সবার প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী যেকোনো সময় মহাদুর্যোগ চলে আসতে পারে। সেই সময় বাংলাদেশের মানুষে যেন খাদ্যে কষ্ট না পায়। আমাদের জমি সীমিত, কিন্তু আমরা রিসার্চ করে আমাদের উৎপাদন বাড়িয়েছি। এটা অব্যাহত রাখতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশকে আমরা উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবেই গড়ে তুলব। আর সেটার জন্য কিন্তু আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে। হঠাৎ করেই কতকগুলো সমস্যা দেখা দিয়েছে। যেমন: ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, কিশোর গ্যাং সৃষ্টি, মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি। এগুলো বিরুদ্ধে আপনাদের আরও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে কারও মুখ চিনে নয়, অপরাধী যেই হোক তাকে অপরাধী হিসেবেই দেখবেন।’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি করেছে। কিন্তু আরও আমরা উন্নতি করতে চাই। এই দেশটাকে আমরা গড়ে তুলতে চাই উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে। আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।’ শেখ হাসিনা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, কর্ণফুলী টানেল, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন এবং সারাদেশে যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে বলে জানান। এছাড়া করোনার মধ্যেই সরকার যে প্রকল্পগুলো নিচ্ছে এবং যেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে সেগুলোও যাতে ভালো ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন হয় সে বিষয়ে সবাইকে নজর রাখার নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস আমাদের জীবনকে স্থবির করে দিয়েছে। স্থবির সারাবিশ্ব। অনেক মানুষকে আমরা হারিয়েছি। এটা যেন বিস্তার লাভ করতে না পারে সেজন্য যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। কারণ দ্বিতীয় যে ঢেউটা আসছে, সেটা কী পর্যায়ে যাবে এখনও আমরা জানি না। অনেক দেশ অলরেডি লকডাউন করে ফেলেছে, অনেকে কারফিউ দিচ্ছে। আমরা এখনও সহনশীল অবস্থায় আছি। কিন্তু আমাদেরকে খুব সাবধানে চলতে হবে।’ করোনার ভ্যাকসিন অগ্রিম বুকিং দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান শেখ হাসিনা।

জনপ্রশাসনের প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা কোর্স সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করবেন একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটাই হচ্ছে একটা বিষয়। তাই সেখানে স্বাস্থ্যবিধি আপনি যেমন মেনে চলবেন, আপনার সহকর্মীরাও যেন মেনে চলে, দেশবাসী যেন মেনে চলে এবিষয়ে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে।’

জাতির পিতার জীবনী সম্পর্কে জানা দরকার জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কারণ এই দেশটাকে জানতে হলে আর দেশের উন্নয়নটা করতে হলে তার (বঙ্গবন্ধু) চিন্তাভাবনাটা জানাও একান্তভাবে প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশটাকে তিনি চিনতেন জানতেন। তার একটাই লক্ষ্য ছিল যে বাংলাদেশটাকে কীভাবে তিনি উন্নত করবেন।’

১৫ আগস্টের নির্মম নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেটা থমকে দাঁড়ায় জানিয়ে আক্ষেপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যারা তাদের দোসর যারা স্বাধীনতা চায়নি এবং তাদেরই চক্রান্ত এবং ষড়যন্ত্র আর আন্তর্জাতিকভাবে যারা আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, এ চক্রান্তের ফলেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়। যার জন্য বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ব্যহত হয়। কিন্তু আমরা আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর থেকে আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যে কারণে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার প্রদর্শিত পথে দিয়ে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি দেশের উন্নতির। ফলে আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে একটি দেশকে গড়ে তুলতে যা যা করণীয় আমরা এ পর্যন্ত তা করতে সক্ষম হয়েছি।’

২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হবে সেই সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে যাচ্ছেন আপনারাই কিন্তু তখন একটা উচ্চপর্যায়ে যাবেন বা ২০৪১’র কর্ণধার আপনারাই হবেন। বাস্তবায়ন আপনারাই করবেন। কাজেই সেইভাবে নিজেদেরকে গড়ে তুলবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে কোন একটা জাতির জন্য সবসময় একটা দিকনির্দেশনা থাকা দরকার হয়, দিক দর্শন থাকতে হয়, লক্ষ্য থাকতে হয়। একটা লক্ষ্য স্থির না থাকলে কখনো কোন জাতি উন্নতি করতে পারে না। সেই লক্ষ্যটা ঠিকভাবে অর্জনের জন্যই কিন্তু আমরা এই পরিকল্পনা নিয়েছে। এটা একটা কাঠামো।’
বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী আগামী দিনে দেশকে এগিয়ে নিতে সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দিয়ে কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এরপরে যারাই আসবেন দায়িত্বে তারা যেন অন্তত তখনকার যুগের প্রয়োজন মিটিয়ে সেগুলোর কাজে লাগাতে পারেন; একটা লক্ষ্য যদি স্থির থাকে তাহলে প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্ব এখন; প্রযুক্তি পরিবর্তনশীল বিজ্ঞানের যুগ; এখানে গবেষণা এবং বিজ্ঞানের প্রভাব তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেইভাবে পরিকল্পনা নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং সেটা আপনাদের করতে হবে। সেইভাবে নিজেদেরকে প্রস্তুত করবেন।’

‘এ দেশের মানুষ, যারা ভাগ্যহারা মানুষ, যারা গরিব-দুঃখী মানুষ। যাদের জন্য জাতির পিতা সারাটা জীবন তার জীবনটাকে উৎসর্গ করেছেন, তাদের কথা আপনাদের চিন্তা করতে হবে। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনেই আপনাদের কাজ করতে হবে এবং সেইভাবেই আপনারা কাজ করে যাবেন’ বলে আশাবাদ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি কিন্তু সবসময় তার ভাষণে বলতেন এই গবিব-দুঃখী মানুষের কথা। সবসময় সেটাই তিনি করেছেন যে, এদেশের মানুষের ভাগ্যটা কীভাবে পরিবর্তন করবেন। আমাদের এটাই থাকবে আপনাদের কাছে আকাঙ্ক্ষা। আপনাদের যে মেধা, আপনাদের জ্ঞান, বুদ্ধি, মনন সেগুলো আপনারা কাজে লাগাবেন দেশ ও জাতির সেবায়। এ দেশের মানুষ যেন নিরাপদ থাকতে পারে, উন্নত জীবন পেতে পারে। আর বিশ্ব দরবারে আমরা যেন মাথা উঁচু করে চলতে পারি সম্মানের সঙ্গে। মানুষ যেন ন্যায় বিচার পায়, প্রশাসনের সেবা পায়, নিজেদের ভাগ্য তারা গড়তে পারে সেই সুযোপ পায়।’

জনপ্রশাসনের কর্মচারীদের কর্মদক্ষ ও যুগোপযোগী হিসাবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশটাকে উন্নত করতে হলে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো উপযুক্ত কর্মচারী আমরা গড়ে তুলতে চাই। যেন মানুষ তার সেবাটা পায়। সেটাই আপনারা দেবেন, এটিই আপনাদের কাজ।’

জাতির পিতা একটা কথা বলেছেন ১৯৭৫ সালের ২৬মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি একটা ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই দিনের ভাষণের একটা অংশ কোট করছি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অংশ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ‘আপনি চাকরি করেন আপনার মাইনে দেয় গরিব কৃষক… ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন, ওরাই মালিক।’

‘‘অর্থ্যাৎ কোনো মানুষকে অবহেলার চোখে দেখবেন না। তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবেন না। মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে হবে। আমরা ছোটবেলা থেকেই ওটা শিখেছি। আমাদের বাড়ির ড্রাইভারকেও ড্রাইভার সাহেব বলতে হত, আপনি বলতে হত। আমাদের বাড়ির কাজের লোককে কখনো চাকরবাকর বলে হুকুম দিতে পারতাম না এটি নিষিদ্ধ ছিল। আমার বাবা আমাদের হুকুম দিতে দেননি। আমরা দেইনি এবং এখনো তাই করি সেটাই আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। আমরা সেটাই করি। অর্থ্যাৎ মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখতে হবে।’

‘কারণ প্রত্যেকেরই অবদান রয়েছে এই সমাজের প্রতি, প্রত্যেকের অবদান রয়েছে দেশের প্রতি। সে কথাটা মনে রাখতে হবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে সবাই যেন ন্যায়বিচার পায় সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে এবং মানুষ সেবা পাবে আপনাদের কাছ থেকে, কারণ আপনার দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে সেবা দেওয়া, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা মানুষের জীবনমান উন্নত করা।’

Print Friendly, PDF & Email

মতামত