রবিবার, ২৯শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

বিক্রয়কর্মী থেকে আজ হাজার কোটি টাকার মালিক ‘গোল্ডেন মনির’

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

দীর্ঘ ২০ বছরের অধিক সময় ধরে অবৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি এবং রাজউকের ভূমি দখল করে হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পত্তির মালিক হয়েছেন মো. মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির। রাজধানী ঢাকায় তার দখলে রয়েছে দুই শতাধিক প্লট। তিন কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল দুটো গাড়িও ব্যবহার করেন তিনি।

গোয়েন্দা সংস্থার দীর্ঘ অনুসন্ধানে মনিরের বিরুদ্ধে উঠে আসে এসব অনিয়ম। আর তথ্য প্রমাণ হাতে নিয়ে শুক্রবার (২০ নভেম্বর) রাত থেকে শনিবার (২১ নভেম্বর) সকাল পর্যন্ত অব্যাহত অভিযানে রাজধানীর বাড্ডা থেকে গোল্ডেন মনিরকে অস্ত্র ও মাদক এবং বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রাসহ গ্রেফতার করা হয়।

অভিযান শেষে ঘটনাস্থলে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য গণমাধ্যমকে জানান র‍্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ।

এ সময় তার বাসা থেকে ৬শ’ ভরি (আট কেজি)স্বর্ণ, ১০টি দেশের মুদ্রা, এক কোটি নয় লাখ টাকা, বিদেশি পিস্তল ও কয়েক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তার বাসা থেকে তিনটি বিলাশবহুল গাড়িও জব্দ করা হয়েছে। এছাড়াও স্থানে বাড়ি-জমিসহ গোল্ডেন মনিরের দেড় হাজার কোটি টাকার সম্পদ বলে জানা গেছে।

র‌্যাব ওই কর্মকর্তা বলেন, কাপড়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী থেকে স্বর্ণ চোরাচালানকারী হয়ে ওঠেন গোল্ডেন মনির। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজস করে অঢেল অর্থবিত্তের মালিক হন।

র‍্যাবের মুখপাত্র আশিক বিল্লাহ বলেন, তার বাসা থেকে দশটি দেশের বিভিন্ন পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, যার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ৯ লাখ টাকার মতো জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাসায় মিলেছে ৮ কেজি স্বর্ণ ও নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা।

র‌্যাবের মুখপাত্র আরও বলেন, ‘মূল যে অভিযুক্ত মো. মনির হোসেন, তার আরেকটি নাম রয়েছে গোল্ডেন মনির। গোল্ডেন মনির মূলত একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী। স্বর্ণ চোরাকারবারি এবং ভূমির দালাল। তার একটি অটো কার সিলেকশন এর শোরুম রয়েছে। পাশাপাশি গাউসিয়াতে একটি স্বর্ণের দোকানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে।’

আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘আমরা তার বাসা থেকে দুটি বিলাসবহুল অনুমোদনবিহীন বিদেশি গাড়ি জব্দ করতে সক্ষম হয়েছি। যার এক একটি গাড়ির মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। একইভাবে কার সিলেকশন শোরুম থেকেও তিনটি বিলাসবহুল অনুমোদনহীন গাড়ি আমরা জব্দ করতে সক্ষম হয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘গ্রেফতারকৃত মনির ৯০ দশকের দিকে গাউছিয়া মার্কেটে একটি কাপড়ের দোকানের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে কোকারিজের ব্যবসা এবং লাগেজ ব্যবসায় যুক্ত হয় মনির। এ সময় সে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন মালামাল দেশে আনার কাজ শুরু করে। একপর্যায়ে স্বর্ণ চোরাচালান কারবারিদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে ন‌ এবং বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ অবৈধভাবে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তার স্বর্ণ চোরাচালান কারবারিদের রুট ছিল ঢাকা-সিঙ্গাপুর এবং ভারত। এসব দেশ থেকে সে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বাংলাদেশের নিয়ে আসতেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তার নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির।’

র‍্যাবের মুখপাত্র বলেন, ‘স্বর্ণ চোরাচালান কারবারির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা হয়। গোল্ডেন মনিরের আরও একটি পরিচয় রয়েছে তিনি হচ্ছেন ভূমিদস্যু। রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে তিনি বিপুল পরিমাণ ভূমি দখল করে অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। ডিআইটি প্রজেক্ট ছাড়াও বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জে তার ২০০’শর বেশি প্লট আছে বলে র‍্যাব জানতে পেরেছে। এরইমধ্যে ৩০টির কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে। রাজউকের সম্পত্তি বেদখল করে এবং স্বর্ণ চোরাচালানে করে বর্তমানে তার সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটিরও বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘র‍্যাব গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছে। এগুলো আনুষ্ঠানিক তদন্তের জন্য দুদক, বিআরটিএ, মানি লন্ডারিং এর জন্য সিআইডি এবং ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে এনবিআরকে তদন্তের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানাবে র‍্যাব। আমরা তার বিরুদ্ধে মূলত যে ফৌজদারি অপরাধ বিদেশি অনুমোদনবিহীন মুদ্রা রাখা, সে জন্য আমরা বাড্ডা থানায় বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করবে।’

অস্ত্র এবং মাদক রাখার অপরাধে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক অস্ত্র ও মাদকের মামলা করব। গ্রেফতার মনিরকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‍্যাব-৩ এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, শুক্রবার রাত ১০টার পর র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসুর নেতৃত্বে শুরু হয় অভিযান। মনিরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চালানো হয়। এছাড়াও গোল্ডেন মনিরের মেরুল বাড্ডার ছয়তলা ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত