রবিবার, ২৯শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

হঠাৎ নাশকতা: স্বস্তি-অস্বস্তি দুই-ই আছে বিএনপিতে

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

২০১৫ সালে টানা ৯২ দিনের নজীরবিহীন ‘সহিংস’ আন্দোলনের পর গত সাড়ে পাঁচ বছর রাজপথে আন্দোলন করেনি বিএনপি। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলেও মাঠে নামেনি দলটির নেতা-কর্মী সমর্থকেরা। অথচ সেই নেতাকর্মীরাই ঢাকা-১৮ আসনের উপ-নির্বাচনে ‘ব্যাপক কারচুপির’ অভিযোগ তুলে রাজধানী ‍জুড়ে বিক্ষোভ করেছে! বিক্ষোভ চলাকালে রাজধানীর সাতটি স্থানে একযোগে গণপরিবহনে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে একজন নির্বাহী সদস্যের ফাঁস হওয়া ফোনালাপ, নাশকতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের উল্লশিত পোস্ট প্রমাণ করে- রাজধানীতে হঠাৎ ‘অগ্নি সন্ত্রাস’ বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কারা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা না গেলেও— এ ধরনের ঘটনার দায় শেষ পর্যন্ত রাজপথের প্রধান বিরোধী দলেরই ওপরই বর্তায়। সে হিসেবে বিএনপির দিকেই সন্দেহের আঙুল উঠছে। সরকারি দল সরাসরিই বলছে— ‘বিএনপি অগ্নি সন্ত্রাস থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। পুরোনো চেহারায় ফিরেছে তারা।

জানা গেছে, রাজধানীতে হঠাৎ নাশকতার পর নানা মহলের এমন বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে স্বস্তি-অস্বস্তি দুই-ই কাজ করছে বিএনপিতে। দলটির একটি অংশ মনে করছে, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই নিজ নিজ অবস্থান থেকে হঠাৎ প্রতিবাদ ডেকে মাঠে নেমে পড়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। এত দিন যাদের সাংগঠনিক শক্তি ও সাহস নিয়ে নানা মহল থেকে প্রশ্ন তুলেছে, এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে তাদেরকে সমচিত জবাব দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

দলের এই অংশটি মনে করে, হাত গুটিয়ে ঘরে বসে থাকলে দলের অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সমালোচনা ও নিন্দা যাই হোক না কেন, মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা শীর্ষ নেতৃত্বে অপেক্ষায় না থেকে নিজেরা মাঠে নেমে ঠিক কাজটিই করেছে।

বিশেষ করে দলের স্থায়ী কমিটির যে সব সদস্য বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের নিজে থেকে কিছু করে দেখানোর পরামর্শ দেন, তারা যারপরনাই খুশি হয়েছেন বৃহস্পতিবারের ঘটনায়। ঘটনার পরে সংশ্লিষ্ট কর্মী-সমর্থকদের বাহবা দিয়েছেন।

সূত্রমতে, ঢাকা-১৮ আসনের উপ-নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন যেহেতু ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুব দলের সভাপতি সেহেতু সংগঠনটি সাবেক ও বর্তমান নেতারা কিছু একটা করে দেখানো প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছিলেন। সে উপলব্ধি থেকেই নিজেদের মধ্যে দ্রুত সলাপরামর্শ করে হঠাৎ নেমে পড়েন রাস্তায়। অতীতে যুবদলকে নেতৃত্ব দেওয়া বিএনপির শীর্ষ কয়েকজন নেতাও এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং মৌন সম্মতি জ্ঞাপন করেছিলেন।

তবে বিএনপির আরেকটি অংশ হঠাৎ এই নাশকতা নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন। এই অংশটির মতে, ২০১৫ সালের আন্দোলনকে ঘিরে নজিরবিহীন সহিংসতার ফলে বিএনপি সম্পর্কে দেশে এবং দেশের বাইরে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। বিএনপিকে অগ্নি সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হতে হয়েছে। কানাডার আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও অভিহিত করেছেন।

তারা বলছেন, ঠিক যে মুহূর্তে চেষ্টা চলছে দলটিকে গুছিয়ে একটা সাংগঠনিক মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর, সেই মুহূর্তে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিএনপির জন্য শুভ হবে না। বরং নতুন নতুন মামলায় নেতাকর্মীকে ফের ঘর ছাড়া হতে হবে। গুছিয়ে আনা কাজ অনেকটা এলোমেলো হয়ে যাবে।

অবশ্য, প্রকাশ্যে বা আকার-ইঙ্গিতে দলটির শীর্ষ নেতারা কোনো অবস্থাতেই স্বীকার করছেন না যে, এই নাশকতার সঙ্গে বিএনপি জড়িত। বরাবরের মতো এই ঘটনার দায়ও সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীর ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন দলটির নেতারা।

শুক্রবার একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- সরকারের কিছু এজেন্টস থাকে— স্যাবোটিয়ার এজেন্টস। এই এজেন্টরা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে।’

পুরো বিষয়টি সম্পর্কে মন্তব্য জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গতকালের ঘটনা নিয়ে আমাদের দলের মহাসচিব যে বক্তব্য দিয়েছেন, ওটিই দলের বক্তব্য। আমার আলাদা কোনো মত নেই।’

বিষয়টি নিয়ে দলে কোনো স্বস্তি-অস্বস্তি আছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেটা ঘটেছে, সেটা নিয়ে স্বস্তি বোধ করার কিছু নেই। ঘটনাটিকে আমাদের মহাসচিব ন্যাক্কারজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমি তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত।’

Print Friendly, PDF & Email

মতামত