শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

সেনাবাহিনীকে দেশপ্রেম ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করার আহ্বান

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

সেনাবাহিনী দেশের সম্পদ ও মানুষের ভরসা বিশ্বাসের প্রতীক মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আপনাদের সকলকে পেশাগতভাবে দক্ষ, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সৎ ও মঙ্গলময় জীবনের অধিকারী হতে হবে। দেশপ্রেম ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখেই আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ আপনাদেরই আপনজন। আপনাদের পরিবারেরই সাথী। কাজেই তাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে আপনাদের কাজ করতে হবে।’

রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে সেনাবাহিনীর ১০টি ইউনিট-সংস্থাকে জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে সাভার সেনানিবাসে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন।

জাতির পিতার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা স্বাধীন দেশ, আমাদের বিজয়ের পর যখন এই যুদ্ধবিধস্ত দেশটিকে তিনি পুর্নগঠনের কাজে হাত দেন, তখন বাংলাদেশের অবস্থাটা কি ছিল? বাংলাদেশ ২৩ বছর ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশকদের শোষণ বঞ্চনায় একেবারে ক্ষতবিক্ষত, বঞ্চিত-শোষিত, তার ওপর যুদ্ধের ধ্বংসস্তুপ। ধ্বংসস্তুপ থেকেই দেশকে অগ্রগতির পথে যাত্রা শুরু করেন সেসময় সশস্ত্রবাহিনীকে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়ে তিনি একটি প্রতিরক্ষা নীতিমালা তৈরি করে দিয়ে যান।’

তিনি বলেন, ‘সেটা এতই যুগোপযোগী যে, এত বছর পরও সেটা মনে হয় এখনো অত্যন্ত সময়পযোগী। তারই আলোকে আমরা ইতোমধ্যে ফোর্সেস গোল-২০৩০ প্রণয়ন করে আমাদের সেনাবাহিনীসহ সকল বাহিনীর সার্বিক উন্নয়নে আধুনিকায়নে এবং যুগের সাথে তারা তাল মিলিয়ে চলতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। কারণ এই প্রতিরক্ষা নীতিমালা জাতির পিতা আমাদেরকে দিয়ে গেছে, সেখানে একটা সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনাও ছিল। আর সেটাই আজকে আমরা অনুসরণ করে যাচ্ছি।’

‘পতাকা, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই পতাকা। এই পতাকা হচ্ছে একটি জাতির স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব, সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এই পতাকার মান রক্ষা করা, প্রত্যেকেরই দায়িত্ব। প্রতিটি সৈনিক এবং আমি মনে করি সকল জনসাধারণ সবারই দায়িত্ব এই পতাকার মর্যাদা রক্ষা করা। কারণ এটাই হচ্ছে আমাদের একটা প্রতীক, আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের। আর জাতীয় পতাকা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যেকোনো ইউনিটের জন্য একটি সম্মান ও গৌঁরবের বিষয়। আজকে আপনারা সেই স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক জাতীয় পতাকা অর্জন করেছেন। আপনাদের হাতে আমার পক্ষ থেকে সেনাবাহিনী প্রধান তুলে দিয়েছেন। আমার দুভার্গ্য সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারলাম না। এটা সত্যি আমার জন্য খুব কষ্টের।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে যাতায়াত সীমিত হয়ে গেছে। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চেয়েছি, আপনারা সময়মতো যেন পতাকাপ্রাপ্তির অধিকারটা অর্জন করেন, যেন বঞ্চিত না হন। আপনারা এই গৌরব অর্জন করেছেন, আমি আশা করি, জাতির আস্থা বিশ্বাস অটুট থাকবে, দেশ সেবায় আপনারা আত্মনিয়োগ করবেন। দেশ মাতৃকার সেবা করাটাই হচ্ছে সবথেকে বেশি গৌরবের। কাজেই আপনারা সেইদিকেই বিশেষ মনোনিবেশ করবেন।’

‘আওয়ামী লীগ জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন। আওয়ামী লীগ সংগঠন দীর্ঘ ২৪ বছর; জাতির পিতার নির্দেশেই সংগ্রাম করেই স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। কাজেই আমিও মনে করি আমাদের একটা কর্তব্য দেশকে উন্নত করা’-বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, ‘পাশাপাশি বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হবে। আর আমাদের সশস্ত্র বাহিনী বা আমাদের সেনাবাহিনী শুধু এখন শুধু আর আমাদের দেশে সীমাবদ্ধ না। আমরা জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনেও অবদান রেখে যাচ্ছি। তাই আমি সবসময় চেয়েছি, আমাদের সেনাবাহিনী বা আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সবসময় আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সুপ্রশিক্ষিত একটি সেনাবাহিনী গড়ে উঠুক। যেটা জাতির পিতা তার ১৯৭৪ সালের প্রতিরক্ষা নীতিমালাও বলে গেছে। কাজেই সেভাবে আমরা গড়ে তুলতে চাই।’

‘১৯৭৫ সাল আমাদের জন্য একটা কালো দিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সেদিন সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেই সাথে আমার ভাই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন কামাল মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল এবং ছোট্ট ১০ বছরের শিশু রাসেল। তার জীবনের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে সে সেনাবাহিনীর সদস্য হবে। সে স্বপ্নও পূরণ হয়নি। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমার মা কামাল-জামালের নববধূদেরসহ আমাদের পরিবারের প্রায় ১৮ জন সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে। ব্যক্তিগতভাবে আমি আর আমার ছোটবোন বিদেশে ছিলাম বলে বেঁচে যাই। আমরা যারা ১৫ আগস্ট আপনজন হারিয়েছি আমরা স্বজন হারাবার বেদনা নিয়েই বেঁচে আছি। কিন্তু আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, আমি মনে করি তার থেকেও বেশি ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের জনগণের। কারণ জনগণের সেই কাঙ্ক্ষিত উন্নতি, সেই উন্নতিটাও বাধাগ্রস্থ হয়ে গিয়েছিল।’

প্রধানমনন্ত্রী বলেন, ‘সেনাবাহিনী দেশের সম্পদ ও মানুষের ভরসা বিশ্বাসের প্রতীক। আর কোনো সেনাবাহিনী যদি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে না পারে, তাহলে কখনো তারা কোনো বিজয় অর্জন করতে পারে না। তাই আপনাদের সকলকে পেশাগতভাবে দক্ষ, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সৎ ও মঙ্গলময় জীবনের অধিকারী হতে হবে। দেশপ্রেম ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখেই আপনাদেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর বাংলাদেশের জনগণ এরা তো আপনাদেরই আপনজন। আপনাদের পরিবারেরই সাথী। কাজেই তাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে আপনাদের কাজ করতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনী সবসময় মানুষের পাশে আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। করোনাভাইরাসে দীর্ঘ কয়েকমাস যাবৎ আমাদের সেনাবাহিনী ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।’ বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতি ধন্যবাদও জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতি বলেন, ‘একটি কথা সবসময় মনে রাখতে হবে, আমাদের সংবিধান স্বাধীনতার পর মাত্র নয় মাসের মধ্যে জাতির পিতা আমাদের এই সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। যে সংবিধানে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার সব নির্দেশনা দেওয়া আছে। কাজেই সংবিধানকে সমুন্নত রেখে দেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবো। আমি জানি করোনাভাইরাসের কারণে শুধু বাংলাদেশ না, সারাবিশ্বব্যাপী একটা সকলের জন্য একটা স্থবিরতা এসে গেছে। করোনাভাইরাসে আমরা অনেক আপনজনকে হারিয়েছি। অনেক মানুষকে দেশে বিদেশে প্রবাসে হারিয়েছি।’

Print Friendly, PDF & Email

মতামত