মঙ্গলবার, ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

কে হচ্ছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উত্তরসূরী?

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিযুক্ত ছিলেন মাহবুবে আলম। বয়স সত্তর পেরোলেও তারুণ্যে ভরা ছিল তার মন। শরীরকেও রেখেছিলেন ফিট। তাই তাই তো সত্তরোর্ধ্ব শরীর নিয়েও বয়সে তরুণদের সঙ্গে সমান পাল্লা দিয়ে দাপিয়ে বেড়াতেন আদালত চত্বর। সরকারের আস্থাভাজন হওয়ায় জীবদ্দশায় তার বিকল্প কাউকেও খোঁজা হয়নি। করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ দায়িত্ব পালনকালে তার প্রাণ কেড়ে নেওয়ায় আচমকা সেই অমোঘ প্রশ্ন এসে ভিড় করেছে সবার মনে— অ্যাটর্নি জেনারেল পদে মাহবুবে আলমের উত্তরসূরী হবেন কে?

সবেমাত্র সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে জানাজার মাধ্যমে শেষ বিদায় নিয়েছেন দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের কর্মস্থল থেকে। তবুও তার উত্তরসূরীর সন্ধানের প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনেই। চলছে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা। আগ্রহ-কৌতূহল— সবই উড়ে বেড়াচ্ছে রাষ্ট্রের ‍গুরুত্বপূর্ণ ও সাংবিধানিক এই পদটিকে ঘিরে। আর সেইসঙ্গে ভাসছে বেশকিছু নামও।

বিভিন্ন পর্যায়ের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনেকেই মাহবুবে আলমের উত্তরসূরী হিসেবে যোগ্য মনে করছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিনকে। এরই মধ্যে তিনি কাজ ও যোগ্যতায় আইনজীবীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে মাহবুবে আলমের মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা অপূরণীয়। তারপরও কাউকে না কাউকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে যারা আছেন, তাদের মধ্যে যোগ্যতম ব্যক্তিটিরই সেই সুযোগ পাওয়া উচিত। তার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে বারের বর্তমান সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন সেই জায়গাটিতে আলোকিত করতে পারবেন বলে আমার মনে হয়।

সুপ্রিম কোর্টের একাধিক আইনজীবীও ওই সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে একমত। তবে তাদের মনে আবার ভিন্ন প্রশ্ন— সমিতির সভাপতির মতো ‘প্রভাবশালী’ একটি পদ ছেড়ে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব নেবেন কি না! সুযোগ মিললে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার পদটিতে আসীন হওয়ার পরামর্শই আমিন উদ্দিনের কাছে রাখছেন কেউ কেউ।

আইনজীবীদের মধ্যে অনেকেই আবার মনে করছেন, বর্তমানে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্বরত মুরাদ রেজাকে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তাদের এমন ধারণার সপক্ষের যুক্তিগুলোও ফেলনা নয়।

তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে মুরাদ রেজার। অ্যাটর্নি জেনারেলের অবর্তমানে অনেক সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে অংশ নিয়েছেন। তাছাড়া এর আগেও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার নজির রয়েছে। ফলে মুরাদ রেজার সম্ভাবনা এ ক্ষেত্রে বেশ প্রবল বলে ধারণা অনেকেরই।

অন্যদিকে সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরীও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন বলে মনে করছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ মনসুরুল হক চৌধুরীর গ্রহণযোগ্যতা যেমন আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছে, তেমনি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলেও তার সুনাম কম নয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল পদে সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকীর নামও আসছে আলোচনায়। বিশেষ করে সততা ও দক্ষতার খ্যাতির কারণে তিনি আইনজীবী মহলে সুপরিচিত। অ্যাটর্নি জেনারেলের অবর্তমানে এমন ‘হাইপ্রোফাইল’ কাউকে সরকার নিয়োগ দিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করছেন কেউ কেউ। আরেক সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসির নামও শোনা যাচ্ছে। পরবর্তী অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার যোগ্যতা তিনিও রাখেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের তিনিই একমাত্র আইনজীবী, যিনি যুক্তরাজ্যের কুইন্স কাউন্সিল থেকে কিউসি পদধারী। ফলে তার যোগ্যতা নিয়ে নিঃসন্দেহ সবাই।

এছাড়া কিছুদিন আগে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এস এম মুনীরের নাম রয়েছে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল পদের গুঞ্জনে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ঢাকার (এমসিসিআই) সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবিরের নামও কেউ কেউ রাখছেন আলোচনার টেবিলে। সরকার চাইলে তিনিই দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে প্রথম নারী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন। সবসময় নারী ক্ষমতায়নের পক্ষে থাকা সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তাই তাকে বেছে নিতেই পারেন— এমনটিই মনে করছেন কেউ কেউ।

সিনিয়র আইনজীবীরা অবশ্য বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের এই সময়ে সরকার হয়তো তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে হয়তো কেউ পাবেন দায়িত্ব। তার পারফরম্যান্স বিবেচনা করেই পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ অথবা নতুন কারও কাঁধে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। আর এ ক্ষেত্রে সরকার নিজের পছন্দের যে কাউকেই নিয়োগ দিতে পারে রাষ্ট্রপক্ষের সর্বোচ্চ আইনজীবী হিসেবে। জল্পনা-কল্পনার হিসাবগুলো তখন আর না-ও মিলতে পারে।

যার উত্তরসূরী খোঁজা হচ্ছে, সেই মাহবুবে আলম দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি এই পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এরপর সরকার তিন দফা তার মেয়াদ বাড়িয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার পদে থেকেই রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টা ২৫মিনিটে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তার মতো এত দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ অলংকৃত করার নজির আর কেউ রাখতে পারেননি।

মাহবুবে আলম জ্বর-ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন সিএমএইচে। পরে নমুনা পরীক্ষায় তার শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরে করোনামুক্ত হলেও হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে আইসিইউতেও নিতে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর শরীরের সঙ্গে পেরে ওঠেননি। রোববার সন্ধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সোমবার তার পাঁচ দশকের কর্মস্থল সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে জানাজার শেষবারের মতো নেওয়া হয় মিন্টো রোডের বাড়িতে। সেখান থেকে নিয়ে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর মাধ্যমে অবসান ঘটলো এক তুখোড় আইনজীবীর জীবনের।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত