শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

ইউএনওর ওপর হামলার দায় স্বীকার রবিউলের

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

দিনাজপুর ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমকে হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত মূল আসামি রবিউল ইসলাম ঘটনার দায়ভার স্বীকার করে বিচারকের কাছে কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন।

দিনাজপুর ডিবি পুলিশ পরিদর্শক ও এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবু ইমাম জাফর রোববার বিকেল ৪টায় দিনাজপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের সম্মুখে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি মূল আসামি রবিউল ইসলামের বিচারকের কাছে দায়ভার স্বীকার করে কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির অংশ বিশেষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেছেন, ‘এই চাঞ্চল্যকর মামলার গ্রেপ্তারকৃত আসামি রবিউল ইসলাম ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদের মালি পদে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন।’

আবু ইমাম জাফর বলেন, ‘গত জানুয়ারী মাসে ইউএনও ওয়াহিদা খানমের টাকা চুরির অপরাধে তাকে ১ আগস্ট চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ওই চাকর থেকে বরখাস্ত করার ক্ষোভে ইউএনও ওয়াহিদা খানমের প্রতিশোধ নিতে রবিউল এভাবেই হামলা চালিয়ে ইউএনও এবং তার বাবা ওমর আলী শেখকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করেছে বলে নিজের দায়ভার স্বীকার করে বিচারকের নিকট জবানবন্দি প্রদান করেন।’

দিনাজপুর কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক মো. ইসরাইল হোসেন জানান, আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় এই চাঞ্চল্যকর মামলার গ্রেপ্তারকৃত আসামি রবিউল ইসলামকে দু’বারে নয় দিন রিমান্ড শেষে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশ পরিদর্শক আবু ইমাম জাফর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইসমাইল হোসেনের আদালতে সোপর্দ করেন।

মো. ইসরাইল হোসেন জানান, বিচারক তাকে প্রাথমিকভাবে জবানবন্দি প্রদানের আইনগত প্রক্রিয়া আসামি রবিউলকে বুঝিয়ে দিয়ে দুপুর ১২টা থেকে ২ ঘণ্টা সময় বুঝার জন্য সময় দেন। তার নির্ধারিত সময় শেষে দুপুর ২টায় রবিউল স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করলে বিচারক তার জবানবন্দি লেখা শুরু করেন। ২ ঘণ্টাব্যাপী জবানবন্দি লেখা শেষে বিচারক আসামি রবিউলকে জেল হাজতে প্রেরণের আদেশ প্রদান করেন। আজ রোববার বিকেল সাড়ে ৪টায় রবিউলকে আদালত থেকে কড়া পুলিশ পাহাড়ায় প্রেরণ করা হয়।

পুলিশের সূত্রটি জানায়, এই চাঞ্চল্যকর মামলার গ্রেপ্তারকৃত আসামি ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদের বরখাস্তকৃত মালি রবিউল ইসলাম তার জবানবন্দিতে প্রকাশ করেছে, সে গত ১ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টায় দিনাজপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে তৃপ্তি পরিবহন বাস যোগে ওই দিন বিকেল ৫টায় ঘোড়াঘাট উপজেলার ওসমানপুর টিএন্ডটি বাসস্ট্যান্ডে নামেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে রবিউল ওসমানপুর বাজারে যায়। বাজারে অবস্থান করার পর কবিরাজ মশিউর রহমানের দোকানের সম্মুখে বেঞ্চে বসে থাকেন। ওই সময় কবিরাজের দোকানে তারপুত্র সাক্ষী সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বসেছিল এবং সিরাজের সঙ্গে রবিউলের কথা বার্তা হয়েছে। একপর্যায়ে বাজারে দোকান বন্ধ হয়ে গেলে রবিউল রাত ১২টায় ওসমানপুর কওমি মাদ্রাসার সম্মুখ দিয়ে উপজেলা পরিষদে প্রবেশ করা সময় ওই মাদ্রাসার ছাত্র অলিউল্লাহ হকের সঙ্গে তার দেখা ও কথা হয়। এরপর রবিউল পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তার সঙ্গে থাকা ব্যাগ থেকে পিপিই তার শরীরে পরিধান করে উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি বাসভবনে মই দিয়ে দ্বিতীয় তলার ভেন্টিলেটার দিয়ে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে।

তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউএনও ওয়াহিদা খানমকে ঘুম থেকে জাগিয়ে হাতুড়ি দিয়ে তার মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতে গুরুতর জখম করে। ইউএনও চিৎকারে বাসায় থাকা তার বাবা ওমর আলী শেখ ঘটনাস্থলে আসলে তাকেও রবিউল হাতুড়ি দিয়ে আঘাতে গুরুতর জখম করেন। এরপর ইউএনও’র বাসার চাবি নিয়ে রবিউল কিছু টাকা নিয়ে ওই বাসা থেকে নিরাপদে বের হয়ে যায়। এরপর ভোর রাত ৪টায় ওসমানপুর বাসস্ট্যান্ডে ঢাকা থেকে আগত দিনাজপুর গামী হানিফ নৈশ্যকোচ যোগে বিরামপুরে আসে। বিরামপুরে কোচ থামিয়ে থাকা কালীন তার গায়ের জামা, গেঞ্জি ও মাথার ক্যাপ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে।

এরপর বাস যোগে রবিউল ২ সেপ্টেম্বর সকালে দিনাজপুরে আসে এবং নিজারত শাখায় অফিসিয়াল দায়িত্ব পালন শেষে শহর থেকে তার নিজের বাসা বিরল উপজেলা ধামারহাট ভীমপুর গ্রামে যায়। তদন্তকালীন সময়ে রবিউলকে গ্রেপ্তার করার পর ঘটনার সময় পরনে থাকা তার প্যান্ট জব্দ করা হয়। এছাড়া রবিউল রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী হাতুড়ি, চাবির ঝোপা, মই ও অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়েছে বলে তার জবানবন্দিতে স্বীকার করে। সে বলেছে তাকে মিথ্যাভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার ক্ষোভেই ইউএনওকে পিটিয়ে হত্যা চেষ্টা করেছেন। ইউএনও’র বাবা এসময় ঘটনাস্থলে এগিয়ে এসে বাধা দিলে তাকেও রবিউল হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়েছেন বলে তার জবানবন্দিতে দায়ভার স্বীকার করেন।

প্রসঙ্গত, গত ২ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ঘোড়াঘাট ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবাকে তার বাসভবনে দুস্কৃতিকারী হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলী শেখ বর্তমানে ঢাকা নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই মামলায় সন্দেহজনক আরও চারজনকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা দিনাজপুর জেল কারাগারে রয়েছে। তারা হলেন-আসাদুল হক, নাহিদুল ইসলাম পলাশ, নবিরুল ইসলাম ও সান্টু কুমার দাস।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত