সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

সীমান্ত হত্যা বন্ধে আবার প্রতিশ্রুতি পেল বাংলাদেশ

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

সীমান্তে হত্যা বন্ধে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বিএসএফ মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা। তিনি বলেন, অপরাধী‌দের কো‌নো দেশ নেই, সীমা‌ন্তের দুপা‌শেই তা‌দের অবস্থান। তবে সীমান্ত হত্যাকে শূন্যে নামিয়ে আনা হবে।একইসঙ্গে সীমান্ত হত্যার মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকেই দোষারোপ করছেন তিনি।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদরদপ্তরে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে সীমান্ত সম্মেলনের শেষ দিনে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

সীমান্ত হত্যাকে অপ্রত্যাশিত উল্লেখ করে বিএসএফ প্রধান বলেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এ বিষয়ে বিজিবির সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়ত আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তে ‘নন লিথেল’ (প্রাণঘাতী নয় এমন) অস্ত্র ব্যবহারে আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। একেবারে প্রাণ সংশয়ে না পড়লে লিথেল অস্ত্র ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে।

‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাদক-পশু-অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যবসত এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে। তবে সন্ত্রাসীদের গতিবিধি নজরদারি করতে আমাদের দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যেই গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ’

সন্ত্রাসীদের কোনো দেশ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রায় ৭০ ভাগ মৃত্যুই রাতের বেলা অর্থাৎ রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে ঘটে থাকে। এ সময়টাতে সাধারণত নানা ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমই ঘটে থাকে। এ সময়টাতে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন সময় সন্ত্রাসীরা বিএসএফ সদস্যদের চ্যালেঞ্জ করে বসে। এছাড়া রাতের বেলা আবহাওয়া অনুকূলে থাকে না, সবকিছু দৃশ্যমানও থাকে না।

‘এমন ৬০ ভাগের বেশি ঘটনায় বিএসএফ সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন। ৫২ জন বিএসএফ সদস্য বিভিন্ন আক্রমণে আহত হয়েছেন। শুধু আক্রান্ত হলেই বিএসএফ লিথেল অস্ত্র ব্যবহার করে। ’

সন্ত্রাসী কার্মকাণ্ডের জন্যই সীমান্ত হত্যা বেড়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। আমরা সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ সমন্বয়ে জয়েন্ট পেট্রোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। করোনা পরিস্থিতির কারণে এটা বেশ কিছুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। তবে এটা আমরা আবারও ব্যাপকভাবে শুরু করতে চাই। আমরা সীমান্তে মৃত্যু শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে কমিটেড।

সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে সকালে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বিএসএফএর গুলিতে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, এ বিষয়ে বিএসএফ প্রধান বলেন, দিনে কিংবা রাতে যখনই এমন ঘটনা ঘটে, প্রত্যেকটি ঘটনাতেই আমাদের অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়। প্রত্যেকটা ঘটনা খতিয়ে দেখা হয়। এ বিষয়টিও তদন্ত করে ভবিষ্যতের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সীমান্ত হত্যার বিষয়ে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম বলেন, বেশির ভাগ ঘটনাই রাতে ঘটে। সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য কেউ বর্ডার ক্রস করে ভারতে প্রবেশ করলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে আমরা আবারও সীমান্তে যৌথ টহল শুরু করব।

মাদক চোরাচালানের বিষয়ে বিজিবি প্রধান বলেন, মাদকের বিষয়ে আমরা উভয়পক্ষ কনসার্ন। উভয়েই তথ্য আদান-প্রদান করে মাদক চোরালান প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছি।

এই ব্যর্থতা বিজিবির কি না, তা জানতে চাইলে সাফিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত চার হাজার কিলোমিটারের বেশি। নদীনালা, পাহাড়–পর্বত আছে। তারপরও এখন পাঁচ কিলোমিটার পরপর সীমান্তচৌকি আছে।

বিএসএফের মহাপরিচালক বলেন, হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগ ঘটনা ঘটছে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ভোর সাড়ে ৫টার মধ্যে। তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। এ জন্য বিজিবি–বিএসএফ সীমান্তে যৌথ টহল দেবে এবং এলাকার লোকজনের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করবে।

সম্মেলনে বাংলাদেশ ও ভারত ১৪ দফা সিদ্ধান্ত নিলেও সংবাদ সম্মেলনজুড়ে বারবারই সীমান্ত হত্যার প্রসঙ্গ আসে।
২০০০ সালের পর থেকে হত্যাকাণ্ডের ঊর্ধ্বগতি কেন, বিএসএফ বরাবর বলে আসছে তারা আক্রান্ত হলেই কেবল গুলি ছোড়ে, তাহলে গুলি কেন দেহের ওপরের অংশে, ঠাকুরগাঁওয়ে সম্প্রতি সকাল ১০টায় মাছ ধরার সময় গুলি করে বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে, এই ঘটনা কেন ঘটল—এ প্রশ্নগুলো তোলেন সাংবাদিকেরা।

একপর্যায়ে বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্ত হত্যার বাইরের ইস্যুতে প্রশ্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বিজিবি সূত্র, বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও অধিকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সীমান্তে ৩৫ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
বিএসএফের মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে যৌথ টহল বন্ধ থাকায় অপরাধ কিছুটা বেড়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে বলা হয়েছে নন–লেথাল উইপনস (মৃত্যু ঘটায় না এমন অস্ত্র) ব্যবহার করতে, পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালেই তাদের প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিএসএফের ওপর দল বেঁধে হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনাতেই তদন্ত করা হয়েছে। শুধু যে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন, তাই নয়, ভারতীয় নাগরিকেরাও ওই সব ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

বারবার একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও সীমান্তে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রাকেশ আস্থানা বলেছেন, তিনি বিএসএফে নতুন যোগ দিয়েছেন। তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিএসএফের মহাপরিচালক ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে মাদক বাংলাদেশে ঢোকার কথা স্বীকার করেছেন। মাদক নিয়ন্ত্রণে তাঁরা কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন। মাদকসহ যেকোনো পাচারের ইস্যুতে দুই পক্ষ নিয়মিত তথ্য বিনিময়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় বিজিবি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে। সম্মেলনে মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশ নেয়।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবির অতিরিক্ত মহাপরিচালকবৃন্দ ও বিজিবি সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট স্টাফ অফিসার ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা ছিলেন।

সম্মেলনে বিএসএফের মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ছিলেন।

এবারের সম্মেলনে সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি/হত্যা/আহত করা, সীমান্তের অপর প্রান্ত থেকে বাংলাদেশে ফেনসিডিল, গাঁজা, মদ, ইয়াবা, ভায়াগ্রা/সেনেগ্রা ট্যাবলেটসহ মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের চোরাচালান, অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরকদ্রব্য পাচার, বাংলাদেশি নাগরিকদের ধরে নিয়ে যাওয়া/আটক, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম/বাংলাদেশে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করানো, মানসিক ভারসাম্যহীন ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশইন, সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে উন্নয়নমূলক নির্মাণকাজ, উভয় দেশের সীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণকাজ, বাংলাবান্ধা আইসিপিতে দর্শক গ্যালারি নির্মাণ, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা (সিবিএমপি) বাস্তবায়নে যৌথ টহল পরিচালনা, রিজিয়ন/ফ্রন্টিয়ার পর্যায়ের অফিসারদের নিয়মিত বৈঠক আয়োজন, পার্বত্য অঞ্চলে হিল ফ্লাইং প্রশিক্ষণ ও অপারেশন পরিচালনা এবং উভয় বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও বিরাজমান সৌহার্দ্য বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত