শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই: প্রধানমন্ত্রী

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা একটা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবার জন্য আমরা শুদ্ধাচার কর্মপরিকল্পনা নিয়েছিলাম। এখানে আমরা দুর্নীতিমুক্ত একটা ব্যবস্থা করতে চাই, প্রশাসনিক ব্যবস্থ গড়ে তুলতে চাই।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে গণভবন থেকে মন্ত্রণালয়/বিভাগসমুহের ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) স্বাক্ষর এবং এপিএ ও শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ সব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে যুক্ত হয়ে এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি কেন আমরা করেছিলাম? ২০১৫ সাল থেকে এই প্রক্রিয়াটা শুরু করি।২০১৪-১৫ তে আমরা প্রথম করি। একটা হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কারণ মিলিটারি ডিটেকটররা ক্ষমতায় থাকলে কখনও কোন দেশের স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা থাকে না। তাদের ডিকটেটরিয়াল একটা এটিচ্যুডের কারণে। তারা যাই করবে তাই ভালো আর বাকি সবই খারাপ-এ ধরনের একটা মানসিকতা থাকে। অর্থাৎ কুফলটা ভোগ করে সাধারণ মানুষ। আর তাদের ক্ষমতায় সুফলটা শুধুমাত্র তারা এবং তাদের আশেপাশে থেকে গড়ে ওঠা একটা এলিট শ্রেণি তারাই ভোগ করে কিন্তু দেশের মানুষ অবহেলিত থাকে।’

‘সে অবহেলা থেকে মানুষকে মুক্ত করা, জনগণের সেবা করা, জনগণের পাশে যাওয়া সেটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল। সেই জন্যই এটা করা হয়েছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও কাজে গতিশীলতা নিয়ে আসা। সরকারি কর্মসম্পাদনকে ফলাফল নির্ভর করা অর্থাৎ আমরা যে কাজটা করলাম তার আসলে ফলাফলটা কী আসে? কতটুকু অর্জন করলাম বা যে কাজ আমরা হাতে নিলাম তা কতটুকু করতে পারলাম। রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড, সেটা আমরা এখানে ব্যবস্থা নিলাম’ বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, ‘আর সরকারি সম্পদ, এ সম্পদ তো জনগণের সম্পদ। তো জনগণ তার মালিক। যেটা জাতির পিতা তার ভাষণেও বলেছেন। আজকে আমরা যাই পাই, যে আরাম-আয়েশ যতটুকু আমরা পাচ্ছি, বেতন ভাতা থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, গাড়ি সব; এটা কার সম্পদ? জনগণের সম্পদ। সেই জনগণকে আমরা কী দিলাম? জনগণের জন্য আমরা কতটুকু করতে পারলাম? কাজেই সেই সম্পদের যথাযথ ব্যবহারটা হচ্ছে কি না? অর্থাৎ আমরা সারা বছর কষ্ট করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি নিই, যে পরিকল্পনা নিই, সেই পরিকল্পনা কতটুকু সম্পাদন করে সেটা আমরা জনগণের কাছে জনগণের দোরগোড়ায় কতটুকু পৌঁছাতে পারলাম আর সম্পদটা যথাযথভাবে কাজে লাগছে কি না উন্নয়নটা হচ্ছে কি না? জনগণের কাছে যাচ্ছে কি না? সেটাই লক্ষ্য?’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর জাতির পিতার যে স্বপ্ন সেটা আমাদের পূরণ করতে হবে। আমরা ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ একটি দেশ। যে দেশ মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছে সেই দেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলবে কারো কাছে হাত পেতে নয়, ভিক্ষা করে নয়। জাতির পিতা বলেছেন ভিক্ষুক জাতির কোনো ইজ্জত থাকে না। ঠিকই তাই, ৭৫’র পর বাংলাদেশ একটা ইজ্জতহীন দেশ হিসাবে পরিচিত হয়েছিল। সব জায়গায় ভিক্ষার ঝুলি নিয়েই যেত, যেটা আমার খুব কষ্ট হত। কারণ বহু বছর বিদেশে থাকতে হয়েছে, বাইরে থাকতে হয়েছে। আমি দেখেছি তখন বাংলাদেশের অবস্থা। কারণ যেখানেই যেত একটা হাত পাতা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা এবং একটা মর্যাদা নিয়ে চলা। এইগুলি চিন্তা করেই কিন্তু আমরা বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিগুলো করা। আর এই চুক্তিটা কিন্তু শুধুমাত্র আমাদের সচিবালয়ের সচিবরা করছেন তা নয়। এটা কিন্তু পর্যায়ক্রমিকভাবে তাদের নিচের স্তর পর্যন্ত এই চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে।’

এর ফলে হচ্ছে কি প্রশাসনের প্রত্যেকটা স্তরে স্তরে একটা জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে , সম্পদের যথাযথ ব্যবহার সেটাও নিশ্চিত হচ্ছে বলে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘এরইমধ্যে এখন পর্যন্ত আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, মাঠ পর্যায়েও যদি দেখি, ৫১টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ, ৩৪৬ দপ্তর বা সংস্থা, ১৬৩৫টি মাঠ পর্যায়ের অফিস এবং ৪৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বমোট ১৭ হাজার ৭৫টি সরকারি দপ্তর এই বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তার মানে প্রত্যেকটা স্তরেই কিন্তু একটা জবাবদিহিতা এসে যাচ্ছে। কাজেই সেইভাবে কাজের এটা হিসাবটাও আমরা নিতে পারি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই কাজের মধ্য দিয়ে যারা ভাল কাজ করছে তাদের পুরস্কৃত করা।’

যে সকল মন্ত্রণালয় তাদের কাজের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে পুরস্কার পেয়েছে তাদের সকলের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন জানান সরকার প্রধান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘সেই সঙ্গে আমরা যেমন একটা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবার জন্য আমাদের পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। আমরা শুদ্ধাচার কর্মপরিকল্পনা নিয়েছিলাম। এখানে আমরা দুর্নীতিমুক্ত একটা ব্যবস্থা করতে চাই, প্রশাসনিক ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলতে চাই।’

প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয়কে শুদ্ধাচারের বিষয়ে একটা পরিকল্পনা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কীভাবে আপনাদের কাজগুলি সম্পন্ন করবেন এবং আপনাদের সাথে সাথে নিচ স্তর পর্যন্ত এই পরিকল্পনা থাকতে হবে এবং সেটা যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে এবং যারাই এটা কার্যকর করতে পারবেন, তারাই পুরস্কৃত হবেন।’

‘আমি এইটুকু চাই যে, প্রতিবছর যেন পুরস্কারের সংখ্যাটা একটু বাড়ে। কারণ সবাই যতবেশি কাজ করতে পারেন, তত বেশি কম্পিটিশন হবে। আর আপনারা যত বেশি কম্পিটিশন করে কাজ করবেন, আমাদের দেশের মানুষ ততবেশি লাভবান হবে। সেটাই আমি বিশ্বাস করি।’

‘এখানে আমার কোন লাভ নাই। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, আমরা বিজয়ী জাতি। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়েই আমাদের চলতে হবে।’

বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯’র সংক্রমণ পরিস্থিতির কথা তুলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনাভাইরাস সারা বিশ্বের অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছে। সারা বিশ্ববাসী আজ এর ফলে একটা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে আমি আমাদের ছাত্রসমাজের জন্য বেশি করে চিন্তিত। কারণ তাদের লেখাপড়া …এটা আমাদের দেশ বলে না এটা সারাবিশ্বে হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উন্নয়নে সবসময একটা লক্ষ্য হচ্ছে তৃণমূল। যেটা জাতির পিতাও করে গেছেন। তিনি সংবিধানে বিদ্যুৎ সুবিধা শিক্ষা, স্বাস্থ্য অভকাঠামো উন্নয়ন;প্রতিটি মৌলিক চাহিদা পূরণের কথা কিন্তু তিনি সংবিধানে দিয়েছেন এবং তিনি যে পদক্ষেপগুলি নিয়েছিলেন সেটাও কিন্ত ওইভাবে করেছিলেন।’

স্বাধীনতার পর জাতির পিতার নেতৃত্বে দেশ গড়ার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাশাপাশি একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন। এতো অল্প সময়ের মধ্যে তিনি কিন্তু করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি যে ব্যবস্থাটা নিয়েছিলেন, আমাদেও ১৯টা জেলা ছিল। সেই জেলায় যুতগুলি মহকুমা সেই মহকুমাগুলোকে তিনি জেলায় রূপান্তর করলেন। ৬০টি জেলা করে জেলা গর্ভনর নিযুক্ত করে ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে উন্নয়নটা যেন একেবারে সেই তৃণমূল পর্যায় থেকে হয় সেইভাবে তিনি প্রশাসনকে ঢেলে সাজিয়ে সেভাবে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবার একটা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

তিনি আরও বলেন, ‘যখন তিনি এই কর্মসূচিগুলি হাতে নিলেন তখনই তাকে হত্যা করা হল। যুদ্ধবিধস্ত দেশ যখন তিনি গড়ে তোলেন, যখন চারদিকে হাহাকার, খাবার নেই, গোলায় ধান নেই, রাস্তাঘাট নাই, সেইসময় কিন্তু হত্যা করে নাই। যখন তিনি একটা পরিকল্পনা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলেন, দেশের মানুষ তার শুভফল করলো তখনই কিন্তু তাকে হত্যা করা হল। একথা কিন্তু মনে রাখতে হবে। ঠিক ওই সময়টাকে বেছে নিল।তারপরে আবার আমরা পিছনে ফিরে গেলাম।তারপরে যে ইলেকশন-নির্বাচন, সবকিছু একটা এমন জায়গায় চলে গেল, জিয়াউর রহমান একজন সেনা কর্মকর্তা। যেখানে আর্মি রুলসে ছিল, সে কখনো নির্বাচন করতে পারবে না। কিন্তু সে নিজেকে ডিক্লেয়ার দিল রাষ্ট্রপতি হিসাবে। ডিক্লেয়ার দেয়ার পরে প্রথমে হ্যাঁ-না ভোট, তারপরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, তারপর একটা দল গঠন এরপরে আবার নির্বাচন; সেই থেকেই তো আমাদের সমস্ত সিস্টেমটা নষ্ট হলো।’

১৯৭৫ সালের পর থেকে ১৯৮১ সালে আমি যখন বাংলাদেশে এসেছি তখনও বাংলাদেশে রাতে কারফিউ। আমাদেরকে বলা হতো যে এগারটার মধ্যে ঘরে ফিরতে হবে।এগারটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ ছিল। আমি মাঝে মাঝে বক্তৃতায় ঠাট্টা করে বলতাম, জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র দিয়েছে সে তো কারফিউ গণতন্ত্র। ওই জায়গা থেকে দেশেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা এবং দেশকে একটা ভবিষ্যতের জন্য তৈরি। কারণ আজকে আমরা যতটুকুই যা করেছি কাদের জন্য কিসের জন্য করেছি, আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য। আর আমাদের কাজের গতিটা একটু শ্লথ হয়ে গেল। এই কোভিড-১৯ এর জন্য। যেভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে একটা বাধা এসেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এই বাধা অতিক্রম করতে হবে। কারণ এটা শুধু বাংলাদেশ না, সারাবিশ্বব্যাপী অবস্থাটা; এই অবস্থাটা মেনে নিয়ে এরই মধ্যে আমরা কিভাবে কাজ করতে পারি, সেটা আমাদের করতে হবে।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি চলাকালীন সকল সরকার কর্মকর্তা-কর্মচারী, সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থার প্রত্যেকের কর্মকাণ্ডের জন্য প্রশংসার পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদেরও প্রতি ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘এই যে একটা সম্মিলতি প্রচেষ্ঠা আমরা করেছি বলেই আমরা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি। এরই মধ্যে আসল আম্পান ঘুর্ণিঝড়। তারপর আসল বন্যা। নদী ভাঙ্গণে এখন বহু মানুষ গৃহহারা, গৃহহীন।এই সবগুলি কিন্তু মোকাবেলা করতে আমাদের যেমন প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি আমাদের দলের নেতাকর্মীরাও অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে।’

প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসনের সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘সাহসের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং আমাদের উন্নয়নের প্রকল্প বা সব কাজগুলো আপনারা করে যাচ্ছেন। হয়ত প্রথম একমাস দেড়মাস একটু ছিল আমাদের এখন কিন্তু আবার সকলেই অত্যন্ত কষ্ট করে আপনারা কাজ করে যাচ্ছেন।’

অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন স্বাগত বক্তব্য রাখেন। জনপ্রশাসন সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রীপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির ফাইলগুলো প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের নিকট হস্তান্তর করেন। তার আগে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি সই করেন।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত