বৃহস্পতিবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

ডিসেম্বরে বাজারে আসবে সিনোফার্মের টিকা

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সিনোফার্ম বলেছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের কোভিড-১৯ টিকা বাজারে আসবে। তবে এ টিকার দাম সম্ভাব্য অন্য করোনাভাইরাসের টিকার চেয়ে অনেক বেশি হবে। ফরচুন সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে গতকাল শনিবার এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এ সপ্তাহে চীনের একটি সংবাদপত্রকে সিনোফার্মের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লিউ জিংহেন বলেছেন, সিনোফার্ম আশা করছে, তাদের প্রতি ডোজ টিকার দাম কয়েক শ ইউয়ান হবে। তবে দুই ডোজের টিকার দাম এক হাজার ইউয়ান (১৪৫ মার্কিন ডলার) বা ১২ হাজার ২৯৭ টাকার কম হবে। যদিও এ দাম খুব বেশি নয়, তবে বাজারের সম্ভাব্য অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী টিকাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি দামি।

সিনোফার্মের টিকার দাম বেশি হলেও মার্কিন টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না বলেছে, তাদের প্রতি ডোজ টিকার দাম হতে পারে ৩২ থেকে ৩৭ ডলারের মধ্যে। আরেক মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি জনসন অ্যান্ড জনসন সম্প্রতি মার্কিন সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে, যাতে প্রতি ডোজ টিকার দাম ধরা হয়েছে ১০ মার্কিন ডলার।

গত জুলাই মাসে মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান ফাইজার বলেছিল, তাদের সম্ভাব্য টিকাটির প্রতি ডোজের দাম হতে পারে ২০ মার্কিন করে। ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যে টিকাটি তৈরি করছে, তার প্রতি ইনজেকশনের দাম হতে পারে ৩ মার্কিন ডলারের কম।

ফরচুনের প্রতিবেদনে বলা হয়, জনসন অ্যান্ড জনসনের পক্ষ থেকে টিকাটির একটি ডোজ দেওয়ার জন্য কাজ চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে সিনোফার্ম, মডার্না, ফাইজার ও অক্সফোর্ডের টিকাটির দুটি করে ডোজ দিতে হবে। দুটি ডোজের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজটি মূলত টিকাটির একটি বুস্টার শট। প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার চার সপ্তাহ পর বুস্টারটি দিতে হবে, যাতে টিকার কার্যকারিতা বাড়ে।

চীনা সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লিউ জিংহেন সিনোফার্মের দাম নির্ধারণের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলেননি। এ বিষয়ে ফরচুনকেও তাঁরা কোনো মন্তব্য দেননি। লিউ বলেছেন, চীনে করোনাভাইরাস সংক্রমণ কমে আসায় তাঁদের টিকাটি চীনে বিস্তৃত আকারে সরবরাহ করার প্রয়োজন পড়বে না। চীনের ১৪০ কোটি মানুষকে এ টিকার প্রয়োজন পড়বে না। টিকাটি কেবল শিক্ষার্থী ও জনবহুল শহরের অফিস কর্মীদের জন্য প্রয়োজন হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য এটি প্রয়োজন নেই।

তবে লিউয়ের এই দৃষ্টিভঙ্গি অন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মেলে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যখন কোনো টিকা নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হবে, তখন যত বেশিসংখ্যক মানুষকে দেওয়া যাবে, ততই ভালো।

নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য টিকা নিয়ে কাজ করা সংস্থা জিএভিআই বলছে, কোভিড-১৯ দূর করতে এবং হার্ড ইমিউনিটি (ব্যাপক জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ ক্ষমতা) অর্জন করতে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে।

জিএভিআইয়ের প্রধান নির্বাহী সেথ বার্কলে বিবিসিকে বলেছেন, সবাই টিকা না পেলে সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্যে ফেরত যাওয়া, ভ্রমণ বা সাধারণ মানুষের চলাফেরা স্বাভাবিক হবে না। সবাই নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমরা নিরাপদ নই—এ মনোভাব তৈরি করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

লিউ জিংহেন আরও বলেছেন, সিনোফার্ম ইতিমধ্যে ৩০ কোটি মার্কিন ডলার খরচ করে দুটি নতুন টিকা উৎপাদন কারখানা তৈরি করেছে। টিকার দাম বেশি না হলে তাদের বিনিয়োগ উঠে আসবে না। তাদের ওই দুটি টিকা উৎপাদনের কারখানা হচ্ছে বেইজিং ও উহানে। এখান থেকে বছরে ২২ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করা যাবে।

চীনের গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিনোফার্মের টিকার উচ্চ দাম নিয়ে চীনের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় আলোচনা চলছে। চীনে টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ওয়েবুতে একটি সমীক্ষায় ব্যবহারকারীদের কাছে সিনোফার্মের টিকাটি কেনার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এতে ৫০ শতাংশ ব্যবহারকারী নেতিবাচক জবাব দিয়েছেন।

চীনের টিকা সরকারের পক্ষ থেকে বিনা মূল্যে দেওয়া হবে, নাকি সরকার ভর্তুকি দেবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এর আগে গত জুলাই মাসে সিনোফার্ম জানিয়েছিল, তারা সম্মুখভাগের চিকিৎসাকর্মীদের টিকাটি বিনা মূল্যে দেবে।

লিউ জিংহেন বলেছেন, তাঁদের টিকাটির কার্যকারিতা পরীক্ষায় তিনি নিজেও টিকাটি গ্রহণ করেছেন। তিনি আশা করছেন, এ টিকার একটি ডোজেই ৯৭ শতাংশ প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম। ২৮ দিন পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হলে এর কার্যকারিতা শতভাগে পৌঁছাবে।

অবশ্য, অন্য গবেষকেরা বলছেন, সিনোফার্মের টিকাটি কার্যকর কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে। ১৩ আগস্ট সিনোফার্ম তাদের টিকার দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেছে। চীনে ওই পরীক্ষা চালানো হয়।

টিকা বিশেষজ্ঞ ড্রেক লোয়ি সায়েন্স ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন ব্লগে লিখেছেন, ‘সিনোফার্মের টিকাটির ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে আমাদের আরও তথ্য দরকার।’

গত জুলাই মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৫ হাজার মানুষের ওপর সিনোফার্ম তাদের টিকাটির তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চালাচ্ছে। বড় আকারের এ পরীক্ষার ফল মূল্যায়ন করে টিকাটির কার্যকারিতা বোঝা যাবে। সিনোফার্ম তাদের টিকাটি পেরু, মরক্কো, ব্রাজিল ও পাকিস্তানে পরীক্ষা চালাবে। টিকাটি প্রকৃত সুরক্ষা দেয় কি না, তা জানার জন্য এসব পরীক্ষার ফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে বলে জানান টিকা বিশেষজ্ঞ লোয়ি।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত