রবিবার, ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

মামলার ভয়ে আজ জাতির কণ্ঠ রুদ্ধ: মির্জা ফখরুল

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নাগরিক হয়রানির ঘটনা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়ে সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি অভিযোগ করেন, মামলার ভয়ে আজ জাতির কণ্ঠ রুদ্ধ। বিবেকের স্বাধীনতা শৃঙ্খলিত, যা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।

আজ শুক্রবার বেলা ১১টায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল এসব অভিযোগ করেন।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে এই আইনে ১৫৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানি করা হয়েছে। আর্টিকেল ১৯-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ৬৩টি। ২০১৮ সালে ডিজিটাল আইনে ও আইসিটি অ্যাক্ট মিলে মামলা হয়েছে ৭১টি। অন্যদিকে, ২০২০ সালের ২২ জুন পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ১০৮টি। এসব মামলায় আসামি ২০৪ জন। তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক ৪৪ জন। অন্যান্য পেশায় কর্মরত ও সাধারণ মানুষ ১৬০ জন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাগুলোর মূল অভিযোগ হলো ব্যক্তির মানহানি, আক্রমণাত্মক মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শন কিংবা রাষ্ট্রের তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ করা, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, এই সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা প্রতিনিয়ত কীভাবে বিরোধীদলীয় কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীদের সম্মানহানি করছে। কীভাবে আক্রমণাত্মকভাবে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করছে। কীভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে।’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের সুনাম আজ বিশ্বদরবারে দুর্নীতির সূচকের তলানিতে। এ সরকারের নেতা-কর্মীদের করোনা সার্টিফিকেট বিক্রির কারণে ইতালিতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কোনো ব্যক্তিকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। নিউইয়র্ক টাইমসে নেতিবাচক প্রবন্ধ হয় বাংলাদেশকে নিয়ে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের শীর্ষ দেশগুলোয় বাংলাদেশ উঠে আসে।

মির্জা ফখরুল বলেন, গত ছয় মাসে ১২ জন সাংবাদিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ইতিমধ্যেই সংবাদপত্র সম্পাদক পরিষদ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের জন্য সাংবাদিকেরা স্বাধীনভাবে লিখতে পারছেন না।

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, জনসাধারণের মনোজগতে ভীতি সৃষ্টি করাই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের চরিত্র। সেটিই করা হয়েছে ইতিমধ্যে। যে কারণে একসময় গণমাধ্যমের যাঁরা সাহসী উচ্চারণ করতেন, তাঁরা এখন থেমে গেছেন। এর প্রভাব পড়েছে জনসাধারণের মধ্যেও। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের একটি সিনেমার নাম উল্লেখ করে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা, হয়রানির প্রথম আক্রমণ মনোজগতেই যায়। এটি মগজ ধোলাইয়ের একটি প্রক্রিয়া।

বিএনপির মহাসচিব পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ডিজিটাল আইনে মামলা হয়েছে মোট ৩২৭টি। জানুয়ারি মাসে মামলা হয়েছে ৮৬টি। এর মধ্যে থানায় ৪১টি, আদালতে ৪৫টি। ফেব্রুয়ারি মাসে ১১৯টি মামলা হয়েছে। থানায় ৯৫টি, আদালতে ৩৪টি। মার্চ মাসে মামলা হয়েছে ১২২টি। এর মধ্যে থানায় ৭৫টি, আদালতে ৩৭টি। আগের বছর ২০১৯ সালে মোট মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৮৯টি। এর মধ্যে থানায় ৭২১টি, আদালতে ৪৬৮টি।

মির্জা ফখরুল জানান, ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৫৫০টির মতো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। বিচারাধীন মামলা আছে ১ হাজার ৯৫৫টি। ৫৫টি মামলা হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত আছে। বিএনপির মহাসচিবের ভাষ্য, সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে অনেক মামলার খবর সংবাদমাধ্যমে আসে না। তাই মানবাধিকার সংগঠনগুলোও মামলার খোঁজ পায় না। ফলে সেখানকার চিত্র আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশে একটি মাত্র সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল আছে এবং তা ঢাকায়। এতেই বোঝা যায়, নাগরিকদের ন্যায়বিচার পাওয়া কতটা দুরূহ।

মির্জা ফখরুল বলেন, এসব আইনের নগ্ন শিকার হয়েছেন সম্পাদক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ অনেক নিরীহ নাগরিক। তাঁরা অবিলম্বে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও আইসিটি আইনের উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, বিএনপি শুরু থেকেই বলে এসেছে, এই আইন কালো আইন। এই আইন সংবিধানবিরোধী। এই আইন জনগণের কণ্ঠ রোধ করার জন্য সরকারের হাতিয়ার। সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই আইন করেছে।

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি কখনো ক্ষমতায় এলে যেসব আইন মানুষের অধিকার খর্ব করে, মানুষের বাক্‌ ও চিন্তার স্বাধীনতা হরণ করে, সেসব অবশ্যই বাতিল করবে।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত