শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

দুর্ঘটনার দিন ময়ূর–২ লঞ্চ চালাচ্ছিলেন সুকানি নাসির

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড লঞ্চকে ধাক্কা দিয়ে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে দিয়েছিল ময়ূর-২ লঞ্চ। এতে ৩৪ জনের মৃত্যু ঘটে। এ সময় লঞ্চটির মাস্টার আবুল বাশার মোল্লার জায়গায় সুকানি নাসির চালাচ্ছিলেন লঞ্চ। অভিযোগ উঠেছে, মাস্টারের বদলে সুকানি লঞ্চ চালানোর দায়িত্বে থাকায় এত বড় নৌ–দুর্ঘটনা ঘটে। এসব তথ্য দেন সদরঘাট নৌথানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রেজাউল করিম।

বুড়িগঙ্গার লঞ্চ দুর্ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামি ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোররাতে সদরঘাট নৌথানার পুলিশ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

সদরঘাট নৌথানার ওসি রেজাউল করিম বলেন, ‘বুড়িগঙ্গার নৌ–দুর্ঘটনায় করা মামলায় ময়ূর-২ লঞ্চের সুপারভাইজার আবদুস সালামকে আদালতের অনুমতি নিয়ে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি। তাঁর দেওয়া তথ্যে আমরা জানতে পেরেছি, ঘটনার দিন (২৯ জুন) ময়ূর-২ লঞ্চটি সদরঘাটের উল্টো দিকের ডকইয়ার্ডে অলস বসেছিল। সকাল ৯টার দিকে লালকুঠি ঘাটে আসার জন্য লঞ্চটির মাস্টার আবুল বাশার মোল্লা চালাননি। লঞ্চটি তখন চালাচ্ছিলেন সুকানি নাসির উদ্দিন। তিনি চালাতে থাকা অবস্থায়ই ময়ূর–২ মুন্সিগঞ্জ থেকে সদরঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড লঞ্চটিকে ধাক্কা দিয়ে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে দেয়।’

এত সকালে কেন এসেছিল লঞ্চটি
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) মাঠপর্যায়ের একাধিক পরিবহন পরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ময়ূর-২ নামের লঞ্চটি ঢাকা-চাঁদপুর নৌপথে চলাচল করে। লঞ্চটি যাত্রী তোলে লালকুঠি ঘাট থেকে। ঘটনার দিন লঞ্চটির ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল দুপুর ১২টার দিকে। অথচ সেদিন লঞ্চটি সদরঘাটের উল্টো দিকের ঘাট থেকে সকাল ৯টায় লালকুঠি ঘাটে আসার জন্য রওনা হয়।

এত আগে লঞ্চটি সেদিন কেন এসেছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি রেজাউল করিম বলেন, ‘ময়ূর-২ নামের লঞ্চটির সুপারভাইজার আবদুস সালামকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি, লঞ্চের মালিকের দুটি জিনিস লঞ্চের ভেতর রাখা ছিল। সেই জিনিস পৌঁছে দেওয়ার জন্য লঞ্চটি আগেভাগে অলস অবস্থায় না থেকে ঘাটে আসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বুড়িগঙ্গায় সেদিন মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবিয়ে দিয়ে ময়ূর–২ চলে আসে লালকুঠির ঘাটে। তখন লালকুঠির ঘাটে দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএর পরিবহন পরিদর্শকের কাছে ময়ূর-২ লঞ্চের মাস্টার আবুল বাশার যান। সেখানে আসেন শাহ আলম নামের লঞ্চ শ্রমিকনেতা। তাঁদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে ময়ূর-২ নামের লঞ্চটি আবার উল্টো দিকে রেখে তাঁরা সদরঘাট ত্যাগ করেন।

অবশ্য বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক বলেন, সেদিন যদি বিআইডব্লিউটিএর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, পুলিশ বাহিনীর লোক, আনসার সদস্যরা তৎপর থাকতেন, তাহলে আসামিরা ঘাট থেকে পালিয়ে যেতে পারতেন না। সেদিন ঘাটে দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সেদিন যা ঘটেছিল
বুড়িগঙ্গার লঞ্চ দুর্ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ৭ সদস্যের কমিটি ইতিমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদন দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএর তদন্ত কমিটিও। প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গার লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য ময়ূর-২ লঞ্চটিকে দায়ী করা হয়।

তদন্ত কমিটির অন্তত পাঁচজন সদস্য এবং বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনাটি কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, তা ভিডিও দৃশ্যে ভালোভাবে ধরা পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ময়ূর-২ নামের লঞ্চটি বেপরোয়া গতিতে এসে মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটিকে ধাক্কা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়।

সেদিন লঞ্চডুবির ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এঁদের মধ্যে ইরফান নামের এক যাত্রী ময়ূর-২ লঞ্চটি ঘাট থেকে ছেড়ে আসার সময় সে দৃশ্য তিনি মুঠোফোনে ক্যামেরাবন্দী করেন। ইরফান বলেন, ‘আমাদের লঞ্চটি যখন সদরঘাটের কাছাকাছি চলে আসে, তখন আমি লঞ্চের ছাদে আসি। আমি মোবাইল দিয়ে আশপাশের ছবি তুলতে থাকি। আমি দেখি, ময়ূর-২ লঞ্চটি সদরঘাটের উল্টো দিকের ঘাট থেকে আসতে থাকে। ওই লঞ্চের একাধিক ছবি আমি তুলেছি। লঞ্চটি দ্রুত গতি নিয়ে আমাদের কাছে চলে আসে। মুহূর্তের মধ্যে পেছন থেকে এসে আমাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। আমি লঞ্চ থেকে লাফ দিয়ে পানিতে পড়ি। আমি বেঁচে যাই।’

বুড়িগঙ্গার লঞ্চ দুর্ঘটনায় করা মামলার পলাতক ছয় এজাহারভুক্ত আসামি হলেন লঞ্চের মাস্টার আবুল বাশার মোল্লা (৬৫), জাকির হোসেন (৫৪), শিপন হাওলাদার (৪৫), শাকিল হোসেন (২৮), নাসির মৃধা (৪০) ও হৃদয় (২৪)। তাঁদের মধ্যে বাশার দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার ও জাকির হোসেন তৃতীয় শ্রেণির মাস্টার।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত