রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

ঢাকা ছাড়ছে কর্মহীন মানুষ

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

রাজধানীর ওয়ারীতে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন বিপ্লব রহমান। কাজ করতেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। এপ্রিলে তার চাকরি চলে গেছে। ভেবেছিলেন লকডাউন উঠে গেলে নতুন কোনো কাজ পেয়ে যাবেন। কিন্তু তা আর হয়নি। বাধ্য হয়ে শেষ পুঁজিটুকু দিয়ে দুই মাসের ঘরভাড়া মিটিয়ে ভোলার বোরহান উদ্দীনে গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছেন এ মাসেই।

টিকাটুলির এক প্রকাশনা ব্যবসায়ী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) লোন করে দেড় বছর আগে ৬৫ লাখ টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। গত দুমাস ব্যবসা বন্ধ থাকায় জমানো টাকা থেকে কর্মচারীদের বেতন দিয়ে বিদায় করেছেন। কিন্তু দুই মাসে পাহাড় সমান দাঁড়িয়েছে ফ্ল্যাটের কিস্তি। এখন সেই ফ্ল্যাট বিক্রির কথা ভাবছেন তিনি।

এরকম অবস্থা চলছে পুরো রাজধানীর জুড়ে। করোনায় লকডাউন থাকায় অর্থনৈতিক মন্দা চেপে বসেছে বাংলাদেশেসহ পুরোবিশ্বে। এ সময় কারও চাকরি চলে গেছে। কারও বেতন কমে গেছে। আবার কারও কারও কর্মক্ষেত্রই বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে আয়ের পথ বন্ধ, অন্যদিকে বেতন সংকুচিত হওয়ায় অনেকের পক্ষেই ঢাকা শহরে পরিবার নিয়ে বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আয়ের পথ বন্ধ হওয়া এমন অনেক পরিবার গ্রামে চলে গেছেন। আবার অনেকে যাওয়ার চিন্তা করছেন। আর সে কারণে ঢাকার বাড়িওয়ালারাও পড়েছেন লোকসানে। অনেকে দিনের পর দিন টু-লেট লাগিয়েও ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না। কেউ কেউ ভাড়া কমিয়ে দেওয়ার পরও ভাড়াটিয়া খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর যারা ঢাকায় রয়ে গেছেন তারাও অভিজাত এলাকা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় যেখানে বাড়ি পাওয়া যায় সেখানে চলে যাচ্ছেন। ফলে ভাড়াটিয়ার অভাবে ফ্ল্যাটবাড়ি খালি পড়ে থাকছে।

দেশের স্বনামধন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) অফিস মতিঝিল। তিনি থাকেন আরকে মিশন রোড এলাকায়। করোনার প্রভাবে বেতন কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। আর তা আগামী মাস থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে। তাই আগে ভাগেই ২৫ হাজার টাকার ভাড়া বাসা ছেড়ে মুগধায় ১৪ হাজার টাকার বাসায় গিয়ে উঠেছেন। তার আগের বাসার উপরের ফ্ল্যাট মালিক তিন হাজার টাকা ভাড়া কমিয়েও ভাড়াটিয়া ধরে রাখতে পারেননি।
কর্মহীন মানুষ। প্রতিদিনই দেখা যায়, মালপত্র ট্রাকভর্তি করে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। কেউ কেউ মালপত্র রেখেই যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গার্মেন্ট শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ।

এমনই একজন রাজীব হাসান। স্বপ্নের ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন। পিকআপে মালপত্র তুলছিলেন তিনি। মালপত্র বলতে একটি খাট, ছোট একটা আলমারি, টেবিল, ফ্রিজ, টিভি, দুটো চেয়ার আর কয়েকটা বস্তা। মিরপুর মোল্লাপাড়া বস্তিতে থাকতেন তিনি। একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন। তার স্ত্রীর কোলে ২ বছরের বাচ্চা। তিনিও একটি কম্পিউটারের দোকানের লোকদের দুপুরের খাবার রান্না করে সরবরাহ করতেন। কেন ঢাকা ছাড়া?

রাজীব জানান, করোনার ছুটিতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রেস্টুরেন্টটি। পরে চালু হলেও বেচা-বিক্রি নেই। তাই মালিক লোক কমিয়ে দেন। এ তালিকায় তিনিও পড়েছেন। বলেন, কাজ করতেন ৬ জন। এখন কাজ করেন ৩ জন। তার স্ত্রী রান্না করা খাবার সরবরাহ করতেন একটি দোকানে। খোলার পর সেখানেও এখন আর খাবার নেয় না। এ অবস্থায় ঘরে খাবার নেই। বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকাও সম্ভব হচ্ছে না তাদের। তাই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। তাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জে।

রাজীব বলেন, প্রায় ৩ মাস ভাড়া দিতে পারিনি। ১৫ হাজার টাকা বাড়িওয়ালা পান। বাড়িওয়ালা খুব ভালো। কোনো দিন কিছু বলেননি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন থাকা যায়? আয় নেই। খাবো কি তাও জানি না। উপায় না পেয়ে বাড়ি থেকে ধার করে ১০ হাজার টাকা এনে বাড়িওয়ালাকে দিয়েছি। বাড়িওয়ালা ৫ হাজার টাকা পরে দিতে বলেছে। পিকআপ ভাড়া সাড়ে ৬ হাজার টাকা। ধার করে এই টাকাও দিতে হয়েছে। বাড়িতে যাচ্ছি। বাড়িতে কী করবো সেটাও জানি না। তার পরও ভরসা সেখানে স্বজনরা আছে। অন্তত না খেয়ে থাকতে হবে না।

রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকা থেকেই কম-বেশি এমন পরিস্থিতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে টানা ৬৬ দিন সবধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে এমন কঠোর নির্দেশনায় এই দীর্ঘ সময়ে অচল হয়ে পড়ে দেশের অর্থনীতির চাকা, যা এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দিনমজুর থেকে শুরু করে স্বচ্ছল চাকরিজীবীদের মাঝেও এর প্রভাব পড়েছে।

এমনিতেই নানা কারণে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের প্রায় সবসময়ই ঝামেলা থাকতে দেখা গেছে। এবার করোনাভাইরাস দু-পক্ষকেই বিপদে ফেলেছে। করোনায় ঢাকার বেশিরভাগ বাড়িওয়ালাই লোকসানে পড়েছেন। মোহাম্মদপুরে মোহাম্মাদীয়া হাউজিং লিমিটেডের সাত নম্বর রোডের বাড়িওয়ালা আশিকুর রহমান জানান, তার চারতলা বাড়ির দুই পরিবার মে মাসে বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। দুমাস হতে চললো ভাড়াটিয়ার দেখা নেই। স্বাভাবিক সময়ে কখনও বাড়ি এভাবে খালি থাকে না বলে জানান তিনি।

এদিকে গত ৯ জুন ভাড়াটিয়া পরিষদ নামের একটি সংগঠন এপ্রিল, মে ও জুন মাসের ভাড়া মওকুফের দাবিতে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে। সংগঠনের সভাপতি মো. বাহারানে সুলতান বাহার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই কর্মজীবীরা অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। এখন তো অনেকেই বেকার। এদের অধিকাংশ গ্রামে চলে গেছে। আর যারা আছে তাদের ঘরভাড়া দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। তাই আমরা বলছি, লকডাউন ও বিধি-নিষেধ চলাকালীন তিন মাসের ঘর ভাড়া যদি মাফ করে দেয়।’
দেশের চাকরির বাজারে করোনা কতটা ক্ষতি করেছে তার হিসাব যদিও সরকারের কাছে নেই। কিন্তু বেসরকারিভাবে জরিপ করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বলছে, ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি আর লকডাউনে প্রায় ৫ কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। আর বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক বলছে, এই সময়ে ৯৩ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। এখন এই কমে যাওয়া আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে টিকে থাকা নিঃসন্দেহে কঠিন হয়ে পড়বে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন তাদের কোনো আয়ের উৎস নেই। সরকারের অনুদান বোধ করি তারা পাননি। আর পেলেও এই টাকায় তাদের চলা সম্ভব নয়। ফলে তারা গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। তাদের ধারণা হয়তো গ্রামে গেলে এটলিস্ট না খেয়ে মারা যাবেন না। তিনি বলেন, এ অবস্থায় গ্রামে চাপ পড়বে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করে নিতে হবে তাদের। না হলে গ্রামেও তারা একই অবস্থার মুখে পড়বেন। এতেও সরকারের বা ব্যাংকের সাহায্য লাগবে। এদিকে শহরেও জরুরি কাজের জন্য লোক পাওয়া যাবে না।

অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, করোনার কারণে নব্য দরিদ্র গোষ্ঠীর সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই। নতুন মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছিল, তারা নব্য দরিদ্রে পরিণত হবে। তিনি বলেন, তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া খুবই জরুরি।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত