বৃহস্পতিবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

নমুনা সংগ্রহের চেয়ে পরীক্ষা কম হচ্ছে

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

কোভিড-১৯ শনাক্তকরণে দেশে সংগৃহীত অনেক নমুনা অকার্যকর বা বাতিল হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এমন নমুনা ৫ শতাংশের বেশি। যাঁদের নমুনা বাতিল হয়েছে, তাঁদের সবার কাছ থেকে পুনরায় নমুনা নেওয়া হয়নি। ফলে এসব সন্দেহভাজন ব্যক্তির মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়ে গেছে।

দেশে এখন সরকারি-বেসরকারি ৬১টি ল্যাবরেটরিতে করোনা পরীক্ষা হচ্ছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ৬টি পরীক্ষাকেন্দ্রে কথা বলে জানা যায়, মাঠপর্যায়ে দক্ষ সংগ্রহকারী না থাকা, সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষাকেন্দ্র পর্যন্ত পরিবহনব্যবস্থায় ত্রুটি, নমুনা পরীক্ষা যন্ত্রে ত্রুটিসহ বিভিন্ন কারণে নমুনা নষ্ট হচ্ছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সেই নমুনা কেন্দ্রে পাঠানোর ফলেও নমুনা বাতিল হচ্ছে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার তুলনায় নমুনা সংগ্রহ বেশি হয়। সংগ্রহ করা সব নমুনা এক দিনে পরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় প্রতিদিন কিছু নমুনা জমা থাকছে। তবে কেন্দ্রগুলোতে মোট কত অপরক্ষিত নমুনা জমা রয়েছে, সেটির হিসাব পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোট সংগৃহীত নমুনার ৫ শতাংশের বেশি বাতিল হওয়াটা অস্বাভাবিক। নমুনা বাতিল হওয়ায় সন্দেহভাজন রোগীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। পুনরায় নমুনা সংগ্রহ নিশ্চিত করা না হলে, সেটি ভয়াবহ ফল আনতে পারে। পরীক্ষার ফলাফল নিশ্চিত না করলে করোনা সংক্রমিত রোগী সাধারণভাবে ঘোরাফেরা করে আরও অনেককে সংক্রমিত করতে পারে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এ এন নাসিমউদ্দিন আহমেদ বর্তমানে সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্টের সভাপতি। তিনি বলেন, নমুনা নষ্ট হওয়ার ঘটনায় দক্ষ জনশক্তির অভাবটি স্পষ্ট। দক্ষ হাতে কাজ করলে প্রতি হাজারে ১০টি নমুনাও নষ্ট হওয়ার কথা নয়। নমুনা সংগ্রহ থেকে পরীক্ষা করা পর্যন্ত কয়েক ধাপের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। এর কোনো ধাপে ঘাটতি হলে নমুনা নষ্ট হতে পারে।

অকার্যকর হচ্ছে ৫ শতাংশের বেশি নমুনা

গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত দেশে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা হয়েছে ৫ লাখ ৮২ হাজার ৫৪৮টি। গত ৬ এপ্রিল থেকে প্রতিদিনের সংগৃহীত নমুনা ও পরীক্ষার সংখ্যা জানাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দেশে নমুনা পরীক্ষা শুরুর পর থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা হয় ৩ হাজার ৩৪৫টি। এই সময়ের নমুনা সংগ্রহের হিসাব না থাকায় যত পরীক্ষা হয়েছে, ততটি নমুনা সংগৃহীত বলে ধরা হয়েছে। তবে এই সময়েও পরীক্ষার তুলনায় নমুনা বেশি সংগ্রহ হয়েছিল বলে অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

দৈনিক পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৬ এপ্রিল থেকে গতকাল পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ৬ লাখ ১১ হাজার ৭০৭টি। এ সময় পরীক্ষা হয়েছে ৫ লাখ ৭৯ হাজার ২০৩টি। সংগৃহীত ও পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে পার্থক্য ৩২ হাজার ৫০৪টি। সব মিলিয়ে অকার্যকর বা বাতিল হওয়া নমুনা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

দেখা যায়, গত ২৫ মে এক দিনে সংগ্রহ করা নমুনার চেয়ে পরীক্ষা কম হয় ২ হাজার ৯০টি। মূলত জুন মাসে সংগ্রহ করা নমুনার চেয়ে পরীক্ষিত নমুনার ব্যবধান বাড়তে থাকে। গত ১৯ দিনে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৮টি। এ সময় পরীক্ষা করা হয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৮টি নমুনা। পরীক্ষা হয়নি সংগ্রহ করা ২০ হাজার ৪১০টি নমুনা।

করোনা পরীক্ষার ল্যাবরেটরিগুলোর কাজের সমন্বয়ের দায়িত্বে আছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা। তিনি বলেন, কারিগরি ত্রুটি যেকোনো প্রক্রিয়াতেই থাকতে পারে। নমুনার প্রক্রিয়াটি যেহেতু ম্যানুয়াল বিষয়, তাই শতভাগ নিখুঁত হবে না। নমুনা সংগ্রহ, পরিবহনে কিছু নমুনা বাতিল হচ্ছে। আর পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার তুলনায় নমুনা অনেক বেশি আসায় কিছু নমুনা জমে যাচ্ছে।

অদক্ষ হাতে নমুনা সংগ্রহ ও পরিবহনে নষ্ট

নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য নমুনা সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া বেশ জটিল। রোগীর সম্মতির ভিত্তিতে নাক বা মুখের ভেতর একটি সোয়াব স্টিকের ডগায় তুলা দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। মুখের ভেতর সোয়াব স্টিক ঢোকালে অনেক সময় রোগী কাশি দেন। একইভাবে নাক থেকে যখন সোয়াব স্টিক দিয়ে নমুনা নেওয়া হয়, তখন অনেকে হাঁচি দেন। তাই নমুনা সংগ্রহ করতে হয় খুব সতর্কভাবে।

নমুনা সংগ্রহের কাজটি করার কথা মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের। কিন্তু মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সংকট থাকায় মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহের কাজ করছেন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা (সিএইচসিপি)। সিএইচসিপিদের সোয়াব স্টিক ব্যবহার করে নমুনা সংগ্রহের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তাঁদের এক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই কাজে লাগানো হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আলমাছ আলী খান বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি থেকে পাস করা কয়েক হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বেকার আছেন। তাঁরা কাজ করতে আগ্রহী। মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের বাদ দিয়ে এক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্য লোকজনকে কাজে লাগানোর কী কারণ, তা বোধগম্য নয়।

নমুনা সংগ্রহের পর সেটি ভাইরাস ট্রান্সপোর্ট মিডিয়ায় (ভিটিএম) ভরে কুল বক্সে (শীতল বাক্স) করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠাতে হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ভিটিএম না থাকায় সাধারণ স্যালাইনে সোয়াব স্টিক ডুবিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠানো হয়। টিউব বা নলের মুখ ভালোভাবে না আটকানোয় সোয়াব স্টিক ডোবানো লিকুইড বা তরল স্যালাইন পড়ে গিয়ে নমুনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) করোনা শনাক্তের পরীক্ষা শুরু হয় গত ১৭ এপ্রিল। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এখানে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৩ হাজার ৯০৩টি। এই কেন্দ্রে ৪ শতাধিক নমুনা বাতিল করতে হয়েছে। যবিপ্রবির জিনোম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইকবাল কবির বলেন, সংগ্রহ ও পরিবহন পর্যায়ে ত্রুটির কারণে ৫ থেকে ১০ শতাংশ নমুনা বাতিল করতে হচ্ছে।

পুনরায় নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে না

যাঁদের সংগ্রহ করা নমুনা বাতিল হচ্ছে, তাঁদের সবার নমুনা পুনরায় সংগ্রহ করা হচ্ছে না। বরগুনা জেলা থেকে সংগ্রহ করা শতাধিক নমুনা বাতিল হয়েছে। বরগুনা স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘যাঁদের নমুনা বাতিল হয়, তাঁদের জানানো হয়। কেউ আবার আসে, কেউ বিরক্ত হয়ে আসে না। নমুনা নষ্ট হওয়ায় রোগীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।’

তবে বরগুনায় নমুনা বাতিল হওয়া পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুঠোফোনে খুদে বার্তা দিয়ে নমুনা বাতিল হয়েছে জানানো হলেও পুনরায় পরীক্ষার বিষয়ে কিছু জানানো হয় না। তাঁদের মধ্যে একজন পুনরায় নমুনা দিয়েছেন। বরগুনার বেতাগী উপজেলার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জাকির হোসেন। করোনার উগসর্গ থাকায় ৯ জুন সদর হাসপাতালে নমুনা দেন তিনি। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নমুনা দেওয়ার চার দিন পর এসএমএস দেয়। তাতে কী লেখা ছিল, সেটার অর্থ স্পষ্ট বোঝা যায় না। এরপর নানাভাবে চেষ্টা করে আবার নমুনা দিতে পারিনি। এখন অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছি।’

এর আগে গত মাসে পরীক্ষা যন্ত্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেড় হাজারের বেশি অকার্যকর নমুনা পাওয়া গিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জনদের পক্ষ থেকে আপত্তি ও অসন্তোষ জানিয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, যাঁদের নমুনা বাতিল হয়েছিল, তাঁদের সবার নমুনা পুনরায় পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, সংগৃহীত ১ শতাংশ নমুনাও বাতিল হবে না। দেশে এত নমুনা নষ্ট হচ্ছে, এটি সিস্টেমের (ব্যবস্থা) ঘাটতি। একবার নমুনা দেওয়াই যেখানে কষ্টসাধ্য, সেখানে দ্বিতীয়বার নমুনা দেওয়া যথেষ্ট ভোগান্তির। তারপরও যাঁদের নমুনা বাতিল হবে, অবশ্যই পুনরায় তাঁদের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত