শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

সারাদেশে রেড জোন চিহ্নিত করে শুরু হচ্ছে ‘কঠোর লকডাউন’

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

সারাদেশে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের মাত্রা নির্ণয় করে রেড জোন চিহ্নিত করে নতুনভাবে শুরু হতে যাচ্ছে লকডাউন। এ ক্ষেত্রে কঠোরভাবে রেড জোন এলাকাগুলোকে লকডাউন করে নিশ্চিত করা হবে ওই এলাকা থেকে কোনোভাবেই যেন কেউ বাইরে যেতে না পারে। একইসঙ্গে এলাকাভিত্তিক সংক্রমণের মাত্রা বিবেচনায় গ্রিন জোন ও ইয়ালো জোন চিহ্নিত করে সেসব এলাকায় নেওয়া হবে বিশেষ ব্যবস্থা। আর এই ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকছে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্যরা।

এ বিষয়ে শুক্রবার (৫ জুন) এক অনলাইন কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে মতামত দেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে দেশে কোন কোন এলাকায় সংক্রমণের মাত্রা, বেশি তা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত একটা এলাকায় যদি ১ লাখ মানুষ থাকে আর সেখানে ১৮ থেকে ২০ জনের মতো কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে থাকে তবে সেই এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এটা ওয়ার্ড ভিত্তিকও হতে পারে। এক্ষেত্রে কন্টাক্ট ট্রেসিং করে যাদের ইতোমধ্যেই কোভিড-১৯ শনাক্ত করা হয়েছে তাদের এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হবে। যে সব এলাকায় কম চিহ্নিত রোগী থাকবে সেসব এলাকাকে ইয়ালো জোন ও যে সব এলাকায় সংক্রমণ পাওয়া যাবে না সেসব এলাকাকে গ্রিন জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। ইয়ালো জোন ও গ্রিন জোনের কর্মকাণ্ড কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এই জোনের আওতায় থাকা এলাকাগুলোকে রাখা হবে নজরদারিতে। যাতে করে এইসব এলাকা থেকে কেউ রেড জোনে প্রবেশ করতে না পারে। একই সঙ্গে রেড জোনের কেউ যাতে এই সব এলাকায় আসতে না পারে সেজন্য নিশ্চিত করা হবে কঠোর লকডাউন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী থেকেই মূলত শুরু হবে রেড জোন চিহ্নিত করার কাজ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে শুরুতে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এ ব এলাকায় জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি লকডাউন চলাকালীন সময়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যা প্রয়োজন, তার সরবরাহও নিশ্চিত করা হবে। এক্ষেত্রে এসব এলাকায় নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার।

রাজধানী থেকে শুরু হলেও এরপরের ধাপেই নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও নরসিংদীতে এই কার্যক্রম শুরু হবে। এর পর চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ অন্যান্য যেসব স্থানে সংক্রমণের মাত্রা বাড়ছে সেসব এলাকায় এই কার্যক্রম শুরু হবে। ইয়ালো জোনে তুলনামূলকভাবে শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা কম থাকবে রেড জোনের তুলনায়। এক্ষেত্রে সেসব এলাকাকেও নজরদারিতে রাখা হবে। গ্রিন জোন এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হবে যাতে এখানে কোনোভাবে রেড ও ইয়েলো জোন থেকে সংক্রমিত কেউ প্রবেশ করতে না পারে। রেড জোন এলাকায় যেনো কেউ ঘর থেকে বের হতে না পারে সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত এই রেড জোনে কঠোরভাবে নজরদারি করা হবে। যতদিন সেই এলাকায় সংক্রমণের মাত্রা হ্রাস পাবে না ততদিন লকডাউন থাকবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য ও সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান বলেন, ‘এরই মধ্যে এই তিনটা জোনকে ভাগ করা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। গতকালও এ বিষয়ে একটা কনফারেন্স হয়েছে। খুব দ্রুতই এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে। তবে এবার আমরা পূর্ণ পরিকল্পনা নিয়েই অগ্রসর হতে চাচ্ছি। রাজধানী থেকে শুরু করে সারাদেশে রেড জোন চিহ্নিত করে সেসব এলাকাতে কঠোর লকডাউন নিশ্চিত করা হবে। এই এলাকাগুলো হতে পারে ওয়ার্ড ভিত্তিক আবার হতে পারে অঞ্চল ভিত্তিক।’

তিনি বলেন, ‘রেড জোন এলাকায় যেন মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়, সেজন্য সেখানে আলাদা আলাদা করে সবজি ও অন্যান্য সামগ্রী যারা বিক্রি করে তাদের নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। তারা শুধু সেই এলাকাতেই থাকবে। তাদের সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বাইরে থেকে। একইসঙ্গে রেড জোন এলাকায় যদি মাইল্ড কেস বাদে কোনো ক্রিটিক্যাল কেস থাকে, তবে তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। এ জন্য ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’

হাবিবুর রহমান বলেন, ‘রেড জোন এলাকায় নিরাপত্তার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে। এই ক্ষেত্রে যদি প্রশাসনের কঠোর হতে হয়, তবে সেই ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত রোগীদের চিহ্নিত করা হবে কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে। বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে সকল এলাকায় এখন পর্যন্ত যত রোগী শনাক্ত হয়েছে তাদের একটা ম্যাপিং করা হবে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে এই ম্যাপিংয়ের কাজ প্রায় শেষ। এরপরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য এলাকাগুলোতে এখন চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এই ক্ষেত্রে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ও আমাদের সাহায্য করছে। বিশেষজ্ঞরা এখন এগুলো নিয়ে কাজ করছেন। সব কিছু শেষ খুব দ্রুত এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে বাস্তবায়ন হবে।’

ইয়ালো জোন ও গ্রিন জোনের ব্যবস্থা কেমন হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘এ সব এলাকায় অফিস-আদালত চালু রাখা যেতে পারে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে কাজ করছেন। তবে এসব এলাকায় রেড জোনের মতো চলাচলে কড়াকড়ি থাকবে না। সতর্কতা হিসেবে নেওয়া হবে বিশেষ ব্যবস্থা। এছাড়া জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি কোভিড-১৯ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিধি কিভাবে কার্যকর করে তোলা যায়, এ নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।’

যদি কোনো জেলায় স্থানীয় প্রশাসন চায় তবে তারা অনুমতিক্রমে আলাদাভাবে রেড জোন ডিক্লেয়ার করতে পারবে বলেও জানান হাবিবুর রহমান।

এ দিকে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, ‘এরই মধ্যে সংক্রমণের মাত্রা নির্ধারণ করে তিনটি জোনে ভাগ করে এলাকাভিত্তিক লকডাউনের তালিকা প্রস্তুত করে কিছু সুপারিশ ও প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকা ও প্রস্তাবনার বিস্তারিত প্রধানমন্ত্রী কাছ পাঠাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সংযোজন বা বিয়োজন করে সিদ্ধান্ত নেবেন।’

যেসব এলাকায় সংক্রমণের মাত্রা বেশি সেসব এলাকাকে রেড জোনে রাখা হবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ অন্যান্য যেসব এলাকায় সংক্রমণের মাত্রা বেশি সেগুলোকে রেড জোনে রাখা হবে।

উল্লেখ্য, ১ জুন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠক শেষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী উভয়েই সমগ্র দেশকে তিনটি জোনে চিহ্নিত করে কোভিড-১৯ মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হবে বলে জানান।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত