শনিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

চীন কি সত্যিই হারাল করোনাভাইরাসকে

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

দাপ্তরিক পরিসংখ্যান বলছে, চীন ঠেকিয়ে দিয়েছে করোনাভাইরাসকে। গত পাঁচ দিনে চীনা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা গুয়াংডংয়ে স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত কোভিড-১৯–এর রোগী পেয়েছেন মাত্র একজন। তাঁরা বলেছেন, ওই রোগী আক্রান্ত হয়েছিলেন দেশের বাইরে থেকে আসা এক ব্যক্তির মাধ্যমে। সংক্রমণের কেন্দ্র এবং সবচেয়ে বিপর্যস্ত এলাকা উহানের কর্মকর্তারা বলছেন, কোভিড-১৯–মুক্ত পাঁচটি দিন পেরিয়েছেন তাঁরা।

এক মাস আগের তুলনায় এ এক বিরাট অগ্রগতি। উহানে মাসখানেক আগেও প্রতিদিন দুই হাজারের কিছু কম আক্রান্ত হওয়াকে মাইলফলক ধরা হচ্ছিল। দুই মাসের লকডাউন শেষে উহানের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। দেশের অন্য শহরগুলোয় উৎপাদন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দেশটি কাজে ফিরে গেলেও এর বাসিন্দা ও বিশ্লেষকেরা কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমণের হার প্রায় শূন্যে পৌঁছানো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

ওই শহরের একজন বাসিন্দা ওয়াং (২৬) বলছেন, ‘আমি সত্যি ভয় পাচ্ছি, উহানে হয়তো উপসর্গ দেখা দেয়নি—এমন অনেক রোগী আছেন। যখনই সবাই কাজে ফিরবেন, আবারও সংক্রমিত হবেন।’ আরেকজন বাসিন্দা যোগ করলেন, ‘আমি এই সংখ্যা বিশ্বাস করি না। এই সংক্রমণ এত সহজে যাবে না।’

‘যেকোনো বুদ্ধি–বিবেচনাসম্পন্ন মানুষ এই সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবে,’ এমনই মত প্রকাশ করেছেন উহানের একজন স্বেচ্ছাসেবী। আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা প্রকাশ করে যে পোস্ট দিয়েছেন, তার নিচে তিনি এ কথা লিখেও দিয়েছেন।

গত সোমবার হংকংয়ের গণমাধ্যম আরএইটএইচকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উহানের হাসপাতালগুলো যেসব রোগীর শরীরের লক্ষণ আছে, তাঁদেরও পরীক্ষা করছে না। জাপানের কিয়োডো নিউজ গত সপ্তাহের শেষ দিকে এক প্রতিবেদনে স্থানীয় একজন চিকিৎসককে উদ্ধৃত করে লিখেছে, এই মাসের প্রথমার্ধে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সফরের আগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নিয়ে কারসাজি হয়েছে এবং গণহারে আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালগুলো ছেড়ে দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উহানে নতুন করে সংক্রমণের এত অভিযোগ আসছে যে কর্তৃপক্ষ সপ্তাহের শেষের দিকে বিবৃতি দিয়ে সেগুলোকে মিথ্যে বলে দাবি করে।

উদ্বেগের বেশ কিছু কারণের মধ্যে একটি হলো চীনের রোগী বাছাই পদ্ধতি। যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং দক্ষিণ কোরিয়া পরীক্ষা করে যাকেই ‘পজিটিভ’ পেয়েছে, তাকেই নিশ্চিত রোগী বলে ধরে নিয়েছে। কিন্তু চীন উপসর্গ ছিল না—এমন রোগীদের কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত রোগীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেনি।

সোমবার রাতের দিকে উহানের স্বাস্থ্য কমিশন একটি প্রশ্নোত্তরপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে কীভাবে উপসর্গ ছাড়া রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে জানিয়েছে। কেন এই কেসগুলো সংযুক্ত করা হয়নি, সে সম্পর্কে তাদের ব্যাখ্যা হলো রোগীরা ১৪ দিনের কোয়ারান্টিনে ছিলেন। যদি তাঁদের মধ্যে উপসর্গ দেখা যেত, তাহলে ওই সংখ্যা প্রকাশ করা হতো। ‘উপসর্গ নেই—এমন রোগীদের একটা ছোট অংশই কেবল খারাপের দিকে যায়, এর বাইরে বেশির ভাগ নিজেই সেরে উঠেছেন’ বলে ওই বিবৃতিতে বলা হয়।

সমালোচকেরা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, সেরে ওঠা রোগীদের মধ্যে যাঁরা নতুন করে আক্রান্ত হন, তাঁদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস বলছে, উহানের কোয়ারেন্টিন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী সেরে ওঠা রোগীদের ৫ থেকে ১০ শতাংশ নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন। হুবেই প্রদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, ওই রোগীদের নাম আর নতুন করে যুক্ত করা হয়নি। কারণ তাঁদের নাম আগে থেকেই রোগীদের তালিকায় নিবন্ধিত ছিল।

কর্তৃপক্ষ বলছে, যাঁদের উপসর্গ দেখা যায়নি, তাঁদের মধ্যে একজন থেকে অন্যজনে ছড়াতে দেখেননি তাঁরা। কিন্তু চাইনিজ সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে চীনের কাইজিন ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘উহান থেকে সংক্রমণ একেবারেই বিদায় নিয়েছে—এমনটা বলা যাচ্ছে না। এখন কিছু কিছু রোগী উপসর্গ নিয়ে আসছেন।’

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট সরকারি একটি নথি দেখেছে, যেখানে বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারির শেষার্ধে ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত হন, যাঁদের মধ্যে কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায়নি। ৮০ হাজারেরও বেশি সংক্রমণের তালিকায় এই সংখ্যা যুক্ত হয়নি।

প্রথম দিকে করোনাভাইরাস–সম্পর্কিত তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং সংকটকালে জনগণের বিতর্ক ও আলোচনার ওপর ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ থেকেই চীনের দেওয়া এই সংখ্যার প্রতি এ অবিশ্বাস জন্মায়। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হো-ফুং-হাং বলছেন, ‘ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ধামাচাপা দেওয়ার যে চেষ্টা চীনা সরকার করেছে, তারপর আমরা আসলে বিশ্বাসযোগ্য ও জোরালো সাক্ষ্য–প্রমাণ ছাড়া আর কিছু বিশ্বাস করছি না।’

অন্যরা বলছেন, এটা হলো নেতৃত্বের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা। এই মাসের শুরুর দিকে, প্রেসিডেন্ট সি-সহ চীনা নেতারা বারবার অর্থনৈতিক ও উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ওপর জোর দেন। এটা এমন একটা বছর, যখন চীনা অর্থনীতিকে সংগ্রাম করতে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উৎপাদনে নতুন করে ফিরে যাওয়া, একই সময়ে নতুন করে যেন সংক্রমণ না ছড়ায় তা নিশ্চিতের নির্দেশ স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলো মানছে কি না, তা দেখতে একটি টাস্কফোর্স এখন দেশজুড়ে কাজ করছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, ‘এখন চীনের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক কাজ শুরুর ওপর খুবই জোর দিচ্ছে। তাই নির্ভয়ে পুনরুৎপাদনে যাওয়ার একটা উপায় হলো রোগের তথ্য প্রকাশ না করে সেগুলো সরকারের তরফে খুঁজে দেখা ও নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা।’ তিনি মনে করেন, ‘এখনো নতুন করে সংক্রমণের আশঙ্কা আছে, কিন্তু মনে হচ্ছে সরকার এই ঝুঁকিটা নিতে প্রস্তুত আছে।’

যাঁরা ইতিবাচক সব পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তাঁরাও স্বীকার করছেন, এই নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা কঠিন। গত কয়েক মাস বহু নাগরিকের আয় বন্ধ। অনেকেই আর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এভাবে জীবন যাপন করতে চাইছেন না। একজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘কেন ডেটা নিয়ে এত হইচই! এত দিন ধরে উহানকে লকডাউন করে রাখা অযৌক্তিক। মানুষকে তো বাঁচতে হবে।’

উহানের আরেক বাসিন্দার বক্তব্য, ‘কাজে ফিরে যাওয়ার যে চাকা, সেটা ঘুরতে শুরু করেছে এবং থামানোর আর পথ নেই। আমরা যা করতে পারি, তা হলো নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে আর সচেতন থাকতে।’

Print Friendly, PDF & Email

মতামত