শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

উনসত্তরেই স্বাধীন ‘দেশ’ ভেবেছিলেন মুজিব

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

মাল্যভূষিত। হাস্যোজ্জ্বল। সানগ্লাস পরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ রকম এক বিরল আলোকচিত্র পাওয়া গেছে কানাডীয় সাংবাদিক মার্ক গেনের দান করা দলিলপত্র থেকে। মার্ক গেন টাইম ও নিউজউইক–এর সাবেক প্রদায়ক সম্পাদক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন টরন্টো ডেইলি স্টার–এর হংকংভিত্তিক এশীয় ব্যুরো প্রতিনিধি হিসেবে।

১৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বিরল ছবিটি স্ক্যান করে পাঠিয়েছেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিশার রেয়ার বুক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক জন শুজমিথ। ছবির বাঁ প্রান্তে ঝরনা কলমে সবুজ কালিতে ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর: শেখ মুজিবুর রহমান, ১৪ জুলাই ১৯৬৯। গণ–অভ্যুত্থানে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ইয়াহিয়া খান মসনদে। সবাই সাধারণ নির্বাচনের অপেক্ষায়। ২৮ জুলাই ১৯৬৯ ইয়াহিয়া ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন। এমন এক প্রেক্ষাপটে ১৪ জুলাই ১৯৬৯ মার্ক গেন ধানমন্ডির বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকারটি নেন।

সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু মার্ক গেনকে ‘প্রকাশ না করার শর্তে’ যা বলেছিলেন, তা ছিল কার্যত স্বাধীন বাংলাদেশের এক রূপকল্প। বঙ্গবন্ধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে ‘দেশ’ বলে উল্লেখ করে বলেছিলেন, পাকিস্তানিদের ২১ বছরের শোষণ ব্রিটিশদের ২০০ বছরের শোষণকে ছাড়িয়ে গেছে। কেবল সেনাবাহিনী ও বিদেশি সাহায্যের জোরেই তারা এটা পারছে। কিন্তু বুলেট দিয়েও সাত কোটি বাঙালিকে অনির্দিষ্টকাল দাবিয়ে রাখা যাবে না। তাদের উচিত হবে ভিয়েতনাম থেকে শিক্ষা নেওয়া। কারণ, সেখানে পাঁচ লাখের বেশি সৈন্যকে মাত্র কিছু লোক খেয়ে ফেলছে।

বঙ্গবন্ধু এরপর সুনির্দিষ্টভাবে মন্তব্যও করেন, ‘আপনাকে অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে পূর্ব পাকিস্তান দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ। আমাদের তাই দক্ষিণ–পূর্ব এশীয়দের মতোই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে হবে।’

অনুসন্ধানে দেখা যায়, শেখ মুজিবের সঙ্গে মার্ক গেনের যে কথা হয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন মিশনকে তার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছিলেন।

গেনের পেশাগত জীবন বিচিত্র। ১৯০৯ সালে রাশিয়ায় তাঁর জন্ম। ১৯৪৪ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব নেন। পরের বছর গেনের নিউইয়র্কের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালায় এফবিআই। বলা হয়, তল্লাশি করে অবৈধভাবে সংগৃহীত গোপন নথি উদ্ধার করে, যা ছিল মূলত চিয়াং কাইশেকের মাও সে–তুংবিরোধী লড়াই–সংক্রান্ত। তবে তাঁর বিচার হয়নি। ১৯৫০ সালে মার্কিন কংগ্রেসে এর শুনানি হয়। অবমুক্ত করা এফবিআইয়ের নথি অনুযায়ী তিনি ছিলেন সোভিয়েত গুপ্তচর। মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডিক রাসেলের দাবি, গেন ‘ডাবল এজেন্ট’ (মার্কিন–রুশ) ছিলেন। মাও সে–তুংয়ের সঙ্গে গেন বেশ কিছু ব্যক্তিগত বৈঠক করেছেন। ১৯৫২ সাল থেকে গেন কানাডায় অভিবাসী হন। ১৯৮১ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকারের পরদিন ঢাকার তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল লিজলি এ স্কোয়ার্স এক তারবার্তায় (গোপন ঢাকা ২২১১) ওয়াশিংটনকে জানান, মুজিব বলেছেন, সামরিক আইনের অধীনে বাঙালি যত দিন থাকবে, তত দিন তারা নিজেদের দখলদার বাহিনীর অধীনস্থ ভাববে। ‘উপনিবেশে’ বাস করে বাঙালিরা ক্লান্ত। তারা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।

মার্ক গেন লিখেছেন, মুজিবকে দারুণ সুদর্শন লাগছিল। কথা বলছিলেন আন্তরিকভাবে। তবে প্রায়শই মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর কথাগুলো ‘অফ দ্য রেকর্ড’। মুজিব সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব দেখান। প্রথমে তিনি বসেছিলেন ১০ জনের মতো সঙ্গী নিয়ে। আধঘণ্টার মধ্যে মানুষ হয়ে যায় জনা তিরিশেক।

সাক্ষাৎকারটি হয়েছিল ছায়াচ্ছন্ন এক ছোট কক্ষে। সেখানে অনেক ছবি। ছবি ছিল অবিভক্ত বাংলার সর্বশেষ গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক বারোজ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ১৯৫২ সালে চীনে তোলা মুজিবের তিনটি ছবিও ছিল—মাও সে–তুং, চৌ এন লাই এবং লিউ শি চির সঙ্গে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর আমার দেখা নয়াচীন বইয়ে মুদ্রিত আলোকচিত্রে অবশ্য ১৯৫২ সালের ওই ছবিগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায় না। বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালের অক্টোবরে পিস কনফারেন্স অব দ্য এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিয়ন্সে পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্য এবং ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমমন্ত্রী থাকাকালে পাকিস্তান সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে চীন সফর করেন।

দাবিয়ে রাখতে পারবে না

ছবিগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে মুজিব বলেছিলেন, ‘তাঁদের (চীনা নেতারা) সুনজরে আর আমি নেই। আমি আর সেখানে ফিরে যেতে পারি না।’

এরপর মুজিব বলেন, ‘শাসক জান্তার শক্তির উৎস একটিই। সেনাবাহিনী এবং বন্ধুদেশগুলোর কাছ থেকে পাওয়া সরাসরি সাহায্য। আমাকে দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, তারা সাত কোটি মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। যতক্ষণ সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ, ততক্ষণ বাংলার জনগণ অব্যাহতভাবে দখলদার বাহিনীর অধীনেই থেকে যাবে। অবশ্যই আমরা এর বিরুদ্ধে লড়াই করব। নিশ্চিতভাবেই আমরা সামরিক দখলদার বাহিনীর অধীনে আছি। কিন্তু আমাদের কোনো সৈন্যবাহিনী নেই। ব্রিটিশদের অধীনে যে রকম ছিলাম, তেমন উপনিবেশ হয়ে আমরা থাকতে চাই না।’

এক প্রশ্নের জবাবে মুজিব বলেন, রাজনৈতিক কার্যক্রম এখন সীমিত। ‘আমরা সরকারি নীতির সমালোচনা বা সভা-সমাবেশ করতে পারি না। যারা গোপন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারাই কার্যক্রম চালাতে পারে। আমরা যারা সাংবিধানিক রাজনীতি ও প্রকাশ্য আলোচনায় বিশ্বাসী, তারা পারি না। তারা আমাদের অফিস খোলা রাখতে দেয়, কিন্তু জনসভা করতে দেয় না।’

রাজনৈতিক গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘হ্যাঁ, কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে।’ তাঁর নিজের ভাষায়, ‘হ্যাঁ, আমাদের কিছু লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা আমাদের দলকে অবৈধ ঘোষণা করেনি। কিন্তু আমাদের কর্মীরা সভা করতে পারে না। একটি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা সামরিক আইন প্রশাসনের কাছে জনসভা করার অনুমতি চাইতে পারি না। এটা আমাদের মর্যাদা কমায়।’

‘আমি জনগণকে ভালোবাসি’

‘তারা আশা করে যে সামরিক আইন দিয়ে আমার কাছ থেকে আমার জনগণকে তারা বিভক্ত করবে। তারা আসলে বোকার স্বর্গে আছে,…আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি। তারা আমাকে ভালোবাসে। আমি তাদের জন্য দুঃখ–নির্যাতন সয়েছি। আমি নীতির প্রশ্নে লড়াই চালাচ্ছি। তারা অনির্দিষ্টকাল ধরে সামরিক আইন জারি রাখতে পারে না। কারও পক্ষেই মাত্র কয়েকটি বুলেট দিয়ে পাকিস্তানের ১২ কোটি মানুষ এবং পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। ভিয়েতনামের কাছ থেকে তাদের অবশ্যই শিক্ষা নেওয়া উচিত। সেখানে পাঁচ লাখের বেশি মার্কিন সৈন্যকে অল্প কিছু মানুষ খেয়ে ফেলছে।

‘আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে পূর্ব পাকিস্তান একটি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ। আমাদের প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়দের মতোই।

‘পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি পুনর্গঠনে আমাদের একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা আছে। কিন্তু এখন তারা চেষ্টা করছে ভেঙে পড়া এই পুনর্গঠনকে হোয়াইটওয়াশ করার। তারা সেটা পারবে না। ছাত্রদের সামনে অবশ্যই ভবিষ্যৎ থাকতে হবে। অবিলম্বে বন্যা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বেকারত্ব অবশ্যই দূর করতে হবে। এরপর আছে ভূমি ও শ্রম। শ্রমিকদের অবশ্যই ভূমি দিতে হবে। বাঙালিরা মনে করে, পূর্ব পাকিস্তানকে অবশ্যই একটি বাজার এবং একটি উপনিবেশ হিসেবে রাখা যাবে না। গোটা দেশ এবং শহরগুলোতে আমাদের বেকারত্বের হার প্রায় ৭০ লাখ। আমাদের কোনো শিল্প নেই। আমাদের কৃষকেরা ছোট জমিতে কাজ করেন। পুরো পরিবারের জন্য তা পর্যাপ্ত কাজ নিশ্চিত করতে পারে না ।

‘যদি সরকার আমাদের গণতন্ত্র দেয়, আমাদের নিজেদেরই যদি শাসন করতে দেয়,…আমাদের জনগণ গণতন্ত্রমনা। বামপন্থীদের তখন ভয় করার দরকার নেই। ৬ দফার ভিত্তিতে তারা আমাদের স্বায়ত্তশাসন দিক। এক ইউনিট বিলুপ্ত করুক। জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হোক। অবাধ নির্বাচন দিক। যদি তারা নির্বাচন না দেয়, কেউ যদি ভাবে যে সাত কোটি মানুষকে বুলেট দিয়ে দাবায়ে রাখতে পারবে, তাহলে আমরা উদারপন্থীরা খারাপ অবস্থায় পড়ব। সরকারের জানা উচিত যে অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। ক্ষুধার্ত মানুষের কোনো ধর্ম বা দর্শন নেই। ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা তারা করবেই। আমার জনগণ ২১ বছর ধরে বঞ্চিত থেকেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে বামপন্থীরা সুযোগ পেয়ে যাবে। সামরিক আইনের অধীনে কমিউনিস্টরা সংগঠিত হচ্ছে, যেমনটা আইয়ুবের আমলে হয়েছিল। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড সেলে কাজ করে, আর আমরা কার্যক্রম চালাতে পারি না। সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের মনোভাব অবিলম্বে বদলাতে হবে।’

শেখ মুজিবের সংক্ষুব্ধ থাকার কারণগুলো মার্ক গেন তাঁর নিজের মতো করে গ্রন্থনা করেছিলেন। গুরুত্ব অনুসারে নিচে বর্ণিত ক্রম গেন নিজেই করেছিলেন।

শুধু ৫ ভাগের হিস্যা

‘১. দেশের রাজধানী: রাজধানীর আশপাশে যারা থাকে, তারা একটি ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা পেয়ে থাকে। আমাদের ইতিমধ্যেই তিনটি রাজধানী (যেকোনো স্থান থেকে তা বহুদূরে) ছিল। করাচি, পিন্ডি ও ইসলামাবাদ। ৫৬ ভাগ জনগণ এ থেকে কখনো সুবিধা পায়নি। সব টাকা সেখানেই ব্যয় হয়, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ সামান্যই পেয়ে থাকে। তারা কখনোই কোনো রাজধানীর কাছাকাছি নেই।

‘২. কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসন: আমরা জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ, কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ৯০ ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানের। এভাবে পূর্ব পাকিস্তান শুধুই শতকরা ৫ ভাগের হিস্যা পাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি কঙ্কাল আছে মাত্র। কর সংগ্রহ করতে আমাদের শুধু ট্যাক্স কালেক্টর আছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে আমরা ট্যাক্স পাঠিয়ে থাকি। যেন আমরা একটা উপনিবেশ। আমাদের বাজেটের ৩০ শতাংশ কেন্দ্রীয় সরকারে ব্যয় হয়, কিন্তু আমরা উপকার পাই না।

‘৩. সামরিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষা: সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সব সদর দপ্তর এবং সামরিক বাহিনীর ৯০ ভাগ সদস্যই পশ্চিম পাকিস্তানের। প্রতিরক্ষার জন্য আমরা বাজেটের প্রায় ৬৫ ভাগ খরচ করে থাকি। কিন্তু প্রতিরক্ষা বাহিনীতে আমাদের প্রতিনিধিত্ব এমনকি ১০ ভাগও নয়।

‘৪. পুঁজি গঠন: বন্ধুদেশগুলো পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্য দিচ্ছে এবং সেখানেও পূর্ব পাকিস্তান অবহেলিত থাকছে। এখানে পুঁজি গঠন হচ্ছে না। আমরা যখন একবার কিছু লোককে সংসদে নিতে পারলাম, তখন তারা আমাদের স্বার্থরক্ষায় লড়াই করল। কিন্তু ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলেন। আর তখন সংসদ আর সংসদ থাকল না, পরিণত হলো একটি বিতর্ক সভায়। রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে বাঙালিদের অপসারণ করা হয়েছিল।’

গেন বলেন, এ পর্যায়ে আমাদের উভয়ের মধ্যে ‘কড়া বাক্যবিনিময়’ হলো। গেন তখন বঙ্গবন্ধুকে অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে বললেন।

মার্ক গেন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, যদি নির্বাচন আগামীকাল হয় এবং আপনাকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়, তখন আপনার প্রতিক্রিয়া কী হবে? এর উত্তরে মুজিব বলেছিলেন, ‘এটা একটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন। আমি এর উত্তর দিতে পারি না।’ এরপর গেন যখন বললেন, এটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়। কারণ, আপনি একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের নেতা। আপনার অবশ্যই একটি অর্থনৈতিক কর্মসূচি থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে আপনার দলের অবস্থান কী?

শেখ মুজিব তখন বলেন, ‘আমরা অর্থনৈতিক সংস্কারের পক্ষে। আমরা মূলত ব্রিটিশ লেবার পার্টির নীতি অনুসরণ করি। পূর্ব পাকিস্তানে রয়েছে ৫৪ হাজার বর্গমাইল, মানুষ দ্বারা পরিপূর্ণ। আমরা আজ ৭ কোটি মানুষ। আগামী ২০ বছরের মধ্যে হয়ে যেতে পারি ১২ কোটি। এর সবকিছুই একটি পরিকল্পিত পন্থায় অবশ্যই সমাধান করতে হবে। সরকারকে অবশ্যই কুটিরশিল্পের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই একচেটিয়া ব্যবস্থার অবসানে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথম মনোযোগ দিতে হবে বন্যা নিয়ন্ত্রণে। পূর্ব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজি পাচার বন্ধ করতে হবে। আমরা যত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি, তা পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো যাবে না। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার ৭০ ভাগ আয় করেছে। আজ ২১ বছর পরে আমাদের আয় ৪৫ ভাগে নেমে এসেছে। এটাই প্রমাণ করে যে এটা একটা ঔপনিবেশিক বাজার। আমরা ৭০ থেকে ৪৫ ভাগে নেমে এসেছি।’

২০০ বছরেরটা ২১ বছরে

‘আমি আমার পশ্চিম পাকিস্তানি বন্ধুদের বলি, আসুন, আমরা বসি এবং দেখি, কতটা বৈদেশিক মুদ্রা আমরা অর্জন করেছি, আর কতটা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেছে। গত ২১ বছরে আমরা কতটা রাজস্ব আয় করেছি, আর তার কতটা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় হয়েছে। যদি প্রয়োজন পড়ে, তাহলে আসুন, জাতিসংঘ থেকে একজন নিরপেক্ষ চেয়ারম্যান আমরা নিয়ে আসি। ব্রিটিশরা গত ২০০ বছরে আমাদের ওপর যা নিপীড়ন চালিয়েছে, তার চেয়ে বেশি নিপীড়ন চলেছে গত ২১ বছরে।

‘পশ্চিম পাকিস্তানিরা কেন এক ইউনিটের জন্য চাপ দিচ্ছে, যখন সিন্ধি কিংবা বালুচরাও এক ইউনিটের অবসান চায়। যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের নিজস্ব গভর্নর নির্বাচন করে থাকেন। ভারতের রাজ্যগুলোর, এমনকি তুরস্কের রয়েছে নিজস্ব প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থা। কিন্তু তারা আমাদের শাসন করে শক্তি ও সৈন্য দিয়ে।

‘কিন্তু এই জান্তা সাত কোটি মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আমার দল বিশ্বাস করে, সহযোগিতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই শুধু আমরা একত্রে জীবন যাপন করতে পারি। কিন্তু তাদের অবশ্যই আমাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেনে নিতে হবে, জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা মানতে হবে। যদি তারা আমাদের অস্বীকার করে, তাহলে শিক্ষা পাবে।’

মার্ক গেনের বর্ণনায়, মুজিব পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ, ভুট্টো ও অন্য রাজনীতিকদের সম্পর্কিত তাঁর একাধিক প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে ভাসানী–সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান। এমনকি গেন লক্ষ করেন, তিনি একটিবারের জন্যও ভাসানীর নাম উচ্চারণ করেননি।

গেন বলেন, কমিউনিস্টদের বিষয়ে কথা বলার সময়ও তিনি শিথিল মনোভাব প্রদর্শন করেন। চাপ দেওয়া হলে তিনি তাঁদের ‘বামপন্থী’ বলে উল্লেখ করেন। গেন যখন বলেন, ভাসানীর খুব শক্তিশালী একটি সংগঠন রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। তখন মুজিব বলেন, ‘আমরা তাঁকে ভয় পাই না। তাঁর ততটা সামর্থ্য নেই। তবে সামরিক কর্তৃপক্ষ অব্যাহত থাকলে বামপন্থীদের একটা সুযোগ রয়েছে।’

কানাডাই শ্রেয়

বঙ্গবন্ধু প্রথমে ভেবেছিলেন, মার্ক গেন অস্ট্রেলিয়ান। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে ভুল শুধরে দিলে তাঁকে কানাডীয় হিসেবে পেয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত হন। মুগ্ধ মুজিব বলেন, ‘কানাডা অসাধারণ। আমাদের জন্যই কানাডা (উদাহরণ)! ফ্রান্সের সঙ্গে আপনাদের সাম্প্রদায়িক সমস্যা ছিল এবং আপনারা তা সমাধান করতে পেরেছেন ।’

গেন বলেন, ‘হ্যাঁ, তবে পুরোটা নয়।’

কিন্তু মুজিব তাঁর কথায় অটল ছিলেন।

‘না, সমাধান আপনারা করেছেন। সবাই বিশ্বাস করে যে তারা (কানাডা) এক জাতি। কানাডা সরকারকে বলুন, যাতে আমাকে তারা আমন্ত্রণ জানায়। আমি কালই যাব। আমি আমেরিকায় যাব না, চীনে যাব না। কিন্তু কানাডায়? হ্যাঁ, যাব। আপনি আপনার রাষ্ট্রদূতকে আমার এ কথা বলুন।’

মার্ক গেন বলেন, মুজিব এটা শুধু কথার কথা বলেননি। তিনি তাঁর কথায় বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি বারবার উল্লেখ করছিলেন যে তাঁর জানামতে কানাডাই একমাত্র জাতি, যাদের একই সমস্যা ছিল, যেমনটা পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের রয়েছে এবং কানাডা তাদের সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিল।

‘সবাই আমার লোক’

সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে ধানমন্ডির বাড়িটির বাগানে গেন বঙ্গবন্ধুর কিছু ছবি তোলেন। মার্ক গেন বলেন, ছবিগুলো আপনাকে পাঠিয়ে দেব। তবে আপনার ঠিকানায় যে এগুলো পৌঁছাবে, তার নিশ্চয়তা কী?

মুজিব জবাব দেন, আপনি উদ্বিগ্ন হবেন না। ডাক বিভাগের কর্মীরা সবাই আমার লোক।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে এ প্রতিবেদক মার্কিন জাতীয় মহাফেজখানা থেকে মার্ক গেনের সাক্ষাৎকারবিষয়ক নথিগুলোর আলোকচিত্র ধারণ করেছিলেন। সেগুলো থেকে স্পষ্ট যে গেনের সঙ্গে মুজিবের ‘অফ দ্য রেকর্ড’ কথাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিল মার্কিন মিশন। মুজিবের সঙ্গে আলোচনার নোটের পরিমাণ ছিল ১০ পৃষ্ঠা। ঢাকার তৎকালীন মার্কিন প্রেস অফিসার স্ট্যানলি রিচ মুজিবের বক্তব্যের প্রতিটি খুঁটিনাটি প্রথমে শর্টহ্যান্ডে, পরে টাইপ করেছিলেন। তার কপি ওয়াশিংটন ছাড়াও করাচি, লাহোর, পেশওয়ার ও রাওয়ালপিন্ডির মার্কিন কনস্যুলেটে পাঠানো হয়। সবাকেই বলা হয়েছিল, মার্ক গেনের নাম যাতে ফাঁস হয়ে না যায়।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত