শনিবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

৭ মার্চের প্রামাণ্যবস্তু প্রধানমন্ত্রীকে দিতে চায় কল-রেডী

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

‘ঐতিহাসিক ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ব্যবহার হওয়া মাইক্রোফোনের স্ট্যান্ডটি আমরা সংরক্ষণ করে রেখেছি। যেসব অ্যামপ্লিফায়ার ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে সাতটি এখনো আছে। মাইক্রোফোনের মধ্যে আছে চারটি। দীর্ঘদিন ধরে আমরা এসব সংরক্ষণ করে আসছি। একটা সংরক্ষণাগারের ব্যবস্থা করা না গেলে এগুলোও হয়তো একসময় নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আমরা চাই এগুলো বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে হস্তান্তর করতে। একমাত্র উনিই এগুলোর মর্ম বুঝবেন’— এসব কথা বলেন কল-রেডীর পরিচালক সাগর ঘোষ ও চেয়ারম্যান বিশ্বনাথ ঘোষ।

কলরেডী সৃষ্টির প্রেক্ষাপট জানিয়ে সাগর ঘোষ বলেন, ‘আমাদের এই প্রতিষ্ঠান দেশভাগের এক বছর পর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে প্রথমে আরজা লাইট হাউজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ঠিক ছয় মাস পরে কলরেডী (আই অ্যাম অলওয়েজ রেডি অন কল অ্যাট ইওর সার্ভিস) নাম দেওয়া হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের ব্যবসায়ী প্রয়াত দয়াল ঘোষ। উনারা ছিলেন ছয় ভাই। এই ছয় ভাইয়েরই এক ভাই হরিপদ ঘোষ আমার বাবা।’

‘আমার জ্যেঠামশাই দয়াল ঘোষ ও আমার বাবা শ্রী হরিপদ ঘোষ ছিলেন কলরেডীর প্রতিষ্ঠাতা। তারা দুই ভাই মিলেই মূলত এই প্রতিষ্ঠানটির ভীত স্থাপন করেন। সে সময় অবহেলিত ছিল পূর্ব পাকিস্তান। আমাদের মাইকের তেমন প্রয়োজন হতো না। বঙ্গবন্ধু তখনো জাতীয় পর্যায়ে সেভাবে উঠে আসেননি।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আমাদের অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রচারণাতেও ছিল আমাদের অংশগ্রহণ। এরপরে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনেও আমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭০-এর নির্বাচনেও আমাদের মাইকের ব্যবহার হতো। এরপরে ৭ই মার্চের ভাষণের বিষয়ে তো সবারই জানা। এর পরেও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যবহার করা হয় আমাদের মাইক। এই হিসেবে বলা যায় আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতেই উপস্থিত ছিল আমাদের প্রতিষ্ঠান।’

বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সময়ে কলে-রেডির অফিসে গেছেন উল্লেখ করে সাগর ঘোষ বলেন, ‘তিনিই ছিলেন তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া একমাত্র নেতা। উনাকে যেদিন বঙ্গবন্ধু বলে ঘোষণা দেওয়া হয় সেদিনও ছিল আমাদের প্রতিষ্ঠানের মাইক।’

‘১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে ১৯৭০-এর নির্বাচন। সেখানে জয়লাভের পরেও আমাদের সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি। এরপরে শুরু হয় চূড়ান্ত আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে পতাকা উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের। এরপরে ৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু আমার বাবা ও জ্যাঠামশাইকে ডাকেন। সেখানে তিনি বলেন, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) একটি জনসভা হবে। সেখানে যেন মাইক লাগানো হয়। কিভাবে লাগাতে হবে, কোথায় লাগাবেন সেসব সিদ্ধান্ত বাবাদের ওপরে ছেড়ে দেওয়া হয়।’

‘বাবা ও জ্যাঠামশাই সেদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা শুনে ফিরে আসেন। উনাদের মধ্যে একটা দায়িত্ববোধ কাজ করে যদিও তখন উনারা বুঝতে পারেননি কী হতে চলেছে। আবার একদিকে ভয়ও কাজ করে কিছুটা কারণ পরিস্থিতি তখন স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে কাজ তো করতেই হবে। টাকার জন্যে নয় বরং স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য কাজ করে যেতে হবে। এরপরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মোতাবেক মাইক লাগানো হলো।’

সাগর ঘোষ জানান, ‘১৯৭১ সালে কানাই ঘোষের বয়স ছিল ১৭-১৮ বছর। ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার হয়েছিল কানাই ঘোষ আর তার দুই ভাইয়ের লাগানো মাইকে। সামরিক বাহিনীর সদস্যরা আশেপাশে থাকার পরও জনসভার আগের দিন ৬ মার্চ কানাই ঘোষ তার অন্য দুই ভাইকে নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে মাইক লাগাতে যান। ৭ মার্চ অনেক ঝুঁকি সত্ত্বেও কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে মাইক লাগিয়েছেন তিনি। বলতে গেলে একপ্রকার হাতে প্রাণ নিয়েই বাবা-কাকারা কাজ করেছেন। সেদিন ৭০টারও বেশি মাইক লাগানোর কথা জানা যায়। বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ শুরু করেন তখন তারা সবাই কাছাকাছিই ছিলেন। কল-রেডীর সেই সময়কার মালিকদের মধ্যে কেউ আর জীবিত নেই। দুই বছর আগে মারা গেছেন কানাই ঘোষ।’

‘ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, সেই ১৮ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণ। এই ভাষণ শুধু পাকিস্তানীদের মনোবলই ভাঙেনি বরং বাংলাদেশের সকলের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ভাষণই ছিল মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা। যে ভাষণকে এখন জাতিসংঘও স্বীকৃতি দিয়েছে।’

দেশ স্বাধীনের পরও বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কল-রেডীর মাইক ব্যবহার করা হতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর শত্রুর ডেরায় মৃত্যুর মুখ থেকে বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু। এরপরে বঙ্গবন্ধুর প্রায় প্রতিটি ভাষণে ব্যবহার করা হতো কল-রেডীর মাইক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশবিরোধী শক্তিরা।’

‘১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। সেদিনও ছিল আমাদের মাইক। সেই থেকে শুরু আবার। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাদের মাইক ব্যবহার করা হয়ে থাকে।’

কিছুটা আক্ষেপের সুরে সাগর ঘোষ বলেন, ‘যুদ্ধ কিন্তু শুধুমাত্র অস্ত্র নিয়ে করলেই হয় না। একটা যুদ্ধে অনেক ধরনের সমর্থন লাগে। যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন সেই সকল মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা বাদেও সেই সময় অনেকে পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কেউ বা অন্ন দিয়ে, কেউ বা বস্ত্র দিয়ে আবার কেউ বা অন্যভাবে সাহায্য করে।’

তিনি বলেন, ”আমরা সবসময়েই গর্ব করি, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে আমাদের কল-রেডী মাইকের লোগো ছিল। এ এক বিশাল স্মৃতি। সেই ভাষণটিই ছিল মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা। এই মাইক্রোফোন দিয়েই সারাদেশের মানুষ স্বাধীনতার ঘোষণা ও নির্দেশনা শুনে। যেখানে বঙ্গবন্ধু পরিষ্কার ভাষায় বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

কল-রেডীকে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি বলে আক্ষেপ সাগর ঘোষের। তিনি বলেন, ‘মানুষ যেকোনো কাজই করুক না কেনো তিনি বা তার প্রতিষ্ঠান একটু কাজের স্বীকৃতিটা চায়। যেকোনো ভালো কাজের স্বীকৃতি সবাই পায়। আমরা ব্যক্তিগতভাবে কিছু চাই না কিন্তু আমরা চাই যে মাইক্রোফোনে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তা যেনো আমরা বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতে তুলে দিতে পারি।’

‘আমার বাবা যখন বেঁচেছিলেন তখন প্রায় সময় বলতেন একদিন এই ঐতিহাসিক মাইক্রোফোনের স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এখন যদি সেটা পাওয়া যায় তবে হয়তো বা উনাদের আত্মা শান্তি পাবে।’

কলরেডীর চেয়ার বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণের জন্য যা যা ব্যবহার করা হয়েছিল তা সবই আছে আমাদের কাছে। আমরা এগুলোকে ঐতিহাসিক নথি মনে করি। সেই মাইক্রোফোনসহ সবকিছু। আওয়ামী লীগ সরকার চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায়। আমরা কখনো বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে যাইনি। কিন্তু তাও চাই এই ঐতিহাসিক সাক্ষীগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করতে।’

তিনি বলেন, ‘অনেকেই আমাদের কাছে আসেন এ সব ঐতিহাসিক সাক্ষীগুলোর কিনে নেওয়ার জন্য। কিন্তু উনারা আসলে এগুলোর মূল্য বুঝবেন না। এগুলোর গুরুত্ব শুধুমাত্র বুঝবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। আর তাই আমরা উনার হাতেই হস্তান্তর করতে চাই।’

Print Friendly, PDF & Email

মতামত