শনিবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

হত্যা নয়, শাবনূরকে নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে আত্মহত্যা করেন সালমান শাহ: পিবিআই

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রজগতের একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি। নায়িকা শাবনূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে পারিবারিক কলহের জেরে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। এমনটাই উঠে এসেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে। আজ সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার। সকালে ধানমন্ডিতে পিবিআইয়ের কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন হয়।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। ওই সময় এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা করেন তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলে উল্লেখ করা হয়। সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন।

২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। প্রায় ১২ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তাতেও সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল মহানগর দায়রা জজ আদালতে আবার রিভিশন আবেদন করেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েস তা মঞ্জুর করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

ডিআইজি মনোজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘পিবিআইয়ের তদন্তে সালমান শাহকে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পারিবারিক কলহ ও মানসিক যন্ত্রণায় তিনি আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবেদনে তার আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণও তুলে ধরেছে সংস্থাটি।’

তদন্তের বিষয়ে বনজ মজুমদার বলেন, ‘২০১৬ সালে পিবিআই তদন্ত শুরু করে। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জবানবন্দি গ্রহণ করতে বেশি সময় লেগেছে। ১৬৪ ধারায় ১০ জনের জবানবন্দি নিয়েছে পিবিআই। এ ছাড়া রয়েছে আরও কয়েকজনের সাক্ষ্য। নতুন করে আলামত হিসেবে একটি ফ্যান জব্দ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ওই ফ্যানেই আত্মহত্যা করেছিলেন সালমান।’

পিবিআই আরও বলছে, শাবনুরের সঙ্গে এই অন্তরঙ্গ সম্পর্কের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ ছিল সালমান শাহ’র। এছাড়া মায়ের প্রতি তার অসীম ভালোবাসা এবং জটিল সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পুঞ্জিভূত আবেগ অভিমানে রূপ নিয়েছিলে সালমানের। সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতাও ছিল তার।

পিবিআই আরও বলছে, সালমান শাহ ছিলেন অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ। যে কারণে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন তিনি। এসবকিছু মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত সালমান শাহ আত্মহত্যাকে নিজের জীবন শেষ করার পথ হিসেবে বেছে নেন।

এদিকে, সালমান শাহ’র স্ত্রী সামিরা ও সহঅভিনেতা শাবনুরের সঙ্গে কথোপকথনে বিপরীতধর্মী বক্তব্য পেয়েছে পিবিআই।

সামিরার বরাত দিয়ে পিবিআই প্রধান বলেন, শাবনূরকে বিয়ে করে সালমান শাহ দুই স্ত্রী নিয়ে সংসার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সামিরা রাজি ছিলেন না। এখান থেকেই পারিবারিক দম্পত্যের কলহ শুরু হয়। তা ছাড়া আগে থেকেই সামিরার শ্বাশুড়ির সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদের ফলে সালমান শাহ ১৯৯১ সালে দুই বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সেসময় সালমান শাহ একবার ৯০টি ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছিলেন এবং একবার স্যাভলন খেয়েছিলেন।

তবে সালমান শাহ’র সঙ্গে অতিরিক্ত অন্তরঙ্গ সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন শাবনুর। এই চিত্রনায়িকার বরাত দিয়ে পিবিআই প্রধান বলেন, একজন অভিনয় শিল্পী হিসেবে সহযোগী শিল্পীর সঙ্গে যেমন সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, সালমান শাহ’র সঙ্গে তার তেমন সম্পর্কই ছিল। এর বাইরে কোনো সম্পর্ক ছিল না।

বনজ কুমার বলেন, ১০ সাক্ষীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি পর্যালোচনা করে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকসহ সবার মতামত বিশ্লেষণ করে প্রমাণ পাওয়া যায়, সালমান শাহ খুন হননি। তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

বনজ কুমার জানান, পিবিআই তাদের তদন্তের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচনা করেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— প্রথম ও দ্বিতীয় সুরতহাল প্রতিবেদন, প্রথম ও দ্বিতীয় ভিসেরা প্রতিবেদন, কেমিক্যাল প্রতিবেদন, প্রথম ও দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, বিশেষ মেডিকেল বোর্ডের মতামত, হস্তলিপি বিশারদের মতামত, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও ভবনে প্রবেশ ও বের হওয়া সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞের মতামত।

এছাড়া রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ ও জরিনা বেগমের অডিও রেকর্ড, সাক্ষীদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি, ঘটনা সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রেকর্ড করা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি, জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা, আগের তদন্ত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন দালিলিক সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, কাগজপত্র ও অন্যান্য সাক্ষ্য পর্যালোচনার বিষয়গুলোও পিবিআইয়ের তদন্তে বিবেচনা করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত