মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

ব্যাংক খাত কিছু ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি: দেবপ্রিয়

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত গুটিকয়েক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ জন্য সরকারের ব্যাংক কমিশন গঠনের উদ্যোগকে সমর্থন ও সাধুবাদ জানিয়েছেন দেবপ্রিয়।

আজ শনিবার ব্যাংক কমিশন গঠন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে নিয়ে সিপিডি এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানেই দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইনে আজ সকালে এ সংবাদ সম্মেলন হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সিপিডি’র সম্মানণীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ অনেকেই।

অনেক জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ব্যাংক খাত নিয়ে একটি কমিশন গঠিত হচ্ছে। আর এই কমিশনের চেয়ারম্যান হচ্ছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বুধবার সচিবালয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্যাংক কমিশন করব। এ জন্য অনেকের সঙ্গেই কথাবার্তা বলতে হবে। যাঁরা সময় দিতে পারেন, দেশের স্বার্থে কাজ করতে পারেন, তাঁদের মধ্য থেকেই কেউ এই কমিশনের দায়িত্ব নেবেন।’ তিনি স্পষ্ট করে কিছু না বললেও এ নিয়ে শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে জানা গেছে।

আজ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। একটা আতঙ্ক, ভয়ংকর, ভঙ্গুর পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছি। খেলাপি ঋণ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। আর লুকিয়ে আছে মূলধন–ঘাটতি, নিরাপত্তা সঞ্চিতির মতো আরও অনেক সূচক। আর এর ফলে মানুষের ব্যাংকে টাকা রাখার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। সুদহার নিয়েও সমস্যা হচ্ছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা দিচ্ছে, তার বরখেলাপ হচ্ছে প্রতিনিয়ত।’

দেবপ্রিয় বলেন, এ মুহূর্তে ব্যাংক খাত নিয়ে আস্থার সঙ্কট আছে। একটা স্বচ্ছতার সঙ্কট আছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততার সঙ্কট আছে। আস্থার সঙ্কট, স্বচ্ছতার সঙ্কট, বিশ্বস্ততার সঙ্কট কাটিয়ে উঠে এ কমিশনকে (ব্যাংকিং কমিশন) কাজ করতে হবে।

অর্থনীতির এ বিশ্লেষক বলেন, ‘এর জন্য সর্বোপরি প্রয়োজন পড়বে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আলোকিত সমর্থন। ওনারা (রাজনৈতিক নেতৃত্ব) যদি এ কমিশনের ওপর একটি এনলাইটেন সাপোর্ট (আলোকিত সমর্থন) না দেন, তাহলে এ কমিশন শুধু একটি কমিশনই থেকে যাবে। ব্যাংক খাতের কার্যকর পরিবর্তনের সুযোগ হয়তো আসবে না।’

তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক সমস্যা এক সময় রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্যায় উপনীত হয়েছিল। রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্যা এখন রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে রাজনৈতিক সমর্থন বাদ দিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ যে সীমিত তা প্রমাণ পায় নতুন ব্যাংক দেয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন ব্যাংক হবে না, তারপরও নতুন তিনটি ব্যাংক হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নাগরিকরা অসহায় আতঙ্ক নিয়ে একটা ভয়ঙ্কর ভঙ্গুর পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছি। এটা শুধু মন্দা ঋণের বিষয় নয়। মন্দা ঋণ অব্যাহত রয়েছে, শত প্রতিশ্রুতি ও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার পরও। এর নিচে লুকিয়ে রয়েছে পুঁজির ঘাটতি, সঞ্চিতির ঘাটতি, বাণিজ্যিক লাভের ঘাটতি। এখন ব্যাংকে মানুষের টাকা রাখার পরিমাণ কমে গেছে।’

সিপিডি ফেলো বলেন, ‘সব থেকে বেশি বিচলিত করছে কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে সব সুবিবেচিত নীতিমালা দেয়া হয়েছে তার প্রকাশ্য বরখেলাপ। বরখেলাপগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেআইনি কার্যকলাপে উপনীত হচ্ছে। ফলে দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানকে এখানে যুক্ত হতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, আমরা দেখছি গুটিকয়েক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে এখন পুরো ব্যাংক খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি যখন ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করছিল, সে রকম একটি পরিস্থিতিতে ২০১২ সালে হল-মার্কের কেলেঙ্কারি উদঘাটিত হয়, তখন থেকে আমরা ব্যাংকিং কমিশনের বিষয়ে বলে আসছি। এখন যেহেতু এটা কিছুটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে আমরা অত্যন্ত প্রিত, খুশি এবং সম্পূর্ণ সাফল্য কামনা করছি।

দেবপ্রিয় বলেন, এ ব্যাংক কমিশন গঠন করতে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে আশীর্বাদ ও সম্মতি এসেছে। এ জন্য আমরা খুবই উচ্ছ্বসিত। আমরা মনে করি, এটা অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। এ কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে, তথ্যনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে কাজ করতে পারে; তার জন্য তাদের পরিবেশ, ক্ষমতা ও সুযোগ দিতে হবে। কমিশনকে জরুরি বিষয়ে দ্রুত সমাধানের জন্য অন্তর্বতীকালীন প্রতিবেদন দিতে হবে। এগুলো আগামী বাজেটের আগেই দিতে হবে।

ব্যাংক কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, স্বচ্ছ, সম্মুখ, তথ্যনির্ভর এবং পূর্ণভাবে একটি মাপকাঠি নির্মাণ করা দরকার বংলাদেশের ব্যাংক খাতে। সেই সঙ্গে প্রকাশিত ও উদঘাটিত পরিস্থিতি জাতীয় অর্থনীতির জন্য কী ধরনের অভিঘাত রাখছে এবং এ পরিস্থিতির তাৎপর্য কী তা বিশ্লেষণ করে কমিশনকে বলতে হবে। একই সঙ্গে বিরাজমান পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকার থেকে ইতোমধ্যে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে তাদের মতামত দিতে হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এমন মানুষকে ওই কমিশনে আনতে হবে, যাঁদের দক্ষতা, যোগ্যতা, বিচক্ষণতা ও সততা থাকবে। তাঁরা যাতে নির্মোহভাবে কাজ করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাঁদের রাজনৈতিক সমর্থন দিতে হবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তাঁরা যে সুপারিশ করবেন, তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক উদ্যোগ থাকতে হবে।

তিনি বলেন, প্রথমত কমিশনের কার্যপরিধি সুনির্দিষ্ট থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত ব্যাংকিং খাতের সঠিক তথ্য পাওয়া এবং পরিসংখ্যানের প্রাপ্ততা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান মূল সমস্যাগুলোর কারণ কি এবং সামনের দিনে চ্যালেঞ্জগুলো কি হতে পারে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতের সমস্যার জন্য কারা এবং কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠি দায়ী তা চিহ্নিত করতে হবে। পঞ্চমত, স্বল্প এবং মধ্য মেয়াদে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সঙ্কট থেকে প্রশাসনিক ও আইনগত কি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তার সুপারিশ তৈরি করা।

তিনি বলেন, একটি সাময়িক কমিশন হিসেবে এর সময় নির্ধারিত থাকতে হবে। তিন থেকে চার মাসের মধ্যে কাজগুলো শেষ করতে হবে। আগামী জুনে বাজেট আসছে। বাজেটের পর পরই যাতে কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

কি পদ্ধতিতে কমিশন কাজ করবে, তার একটি অন্তবর্তীমূলক পদক্ষেপ দরকার। সেজন্য ব্যক্তিখাতের কয়েকজন বড় বড় ব্যবসায়ী বা নীতি নির্ধারকের সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করে সবার সঙ্গে বসে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোক্তা, সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ছোট বড় সঞ্চয়কারী, বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, ব্যাংক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নারী, যুবক এবং ঢাকার বাইরের জনগণ। অর্থাৎ যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীল তাদের সবাইকে আলোচনার মধ্যে নিয়ে আসা উচিত।

চতুর্থত হলো, ব্যাংকিং কমিশনের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। বিভিন্ন সময়েই কমিটি, কমিশন ও তদন্ত কমিশন গঠন হয়ে থাকে। সেগুলোর সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকে না। এ কারণে এই কমিশন গঠন হলে তাকে পূর্ণ স্বচ্ছ হতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, কমিশনের সদস্যদের দক্ষতা, যোগ্যতা এবং সততাই হবে একমাত্র যোগ্যতা। যাতে তারা নির্মোহভাবে প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করতে পারেন। কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।

এছাড়া, সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন, অর্থ্যাৎ কমিশন যে সুপারিশ দেবে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। কমিশন গঠনের সময়ই স্পষ্টভাবে দিক নির্দেশনা দিয়ে একটি রোডম্যাপ দিতে হবে। একইসঙ্গে সুপারিশগুলো কবে থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে তারও একটা ঘোষণা থাকতে হবে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার দাবি করে অনুষ্ঠানে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভারত সরকার এ জাতীয় উদ্যোগ নিয়েছে। আমরাও এটা করতে পারি।’

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংক কমিশন গঠনের উদ্যোগকে অভিনন্দন জানাই। তবে সেই সমর্থন শর্তসাপেক্ষ। শর্তটি হলো এই কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে।’

Print Friendly, PDF & Email

মতামত