শুক্রবার, ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

আগ্রহ না থাকলেও ৩ কারণে নির্বাচনে থাকছে বিএনপি

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির নির্বাচনের পর আর কোনো ভোটে আগ্রহ না থাকলেও তিনটি কারণে নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি। এগুলো হচ্ছে প্রথমত সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তিকে এক প্লাটফর্মে আনা; দ্বিতীয়ত পাল্টা কৌশলে সরকারের নির্বাচনী প্রহসনের স্বরূপ উন্মোচন এবং তৃতীয়ত সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে জনগণকে প্রস্তুত করা। এই অবস্থায় গাইবান্ধা-৩, বাগেরহাট-৪, ঢাকা-১০ আসনে উপনির্বাচন এবং চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। তারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার ঘনিষ্ঠজন, স্থায়ী কমিটিসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে যাওয়ার এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গত সোমবার রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতাদের কথাবার্তায় অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচন ও ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আমাদের নির্বাচনে যাওয়ার আগের যে সিদ্ধান্ত তা পরিবর্তন হয়নি। ফলে সামনের নির্বাচনগুলোতেও আমরা আছি।

আগামী নির্বাচনগুলোতে বিএনপির অংশ নেওয়ার পক্ষে দলের সিনিয়র এ নীতিনির্ধারক আরও বলেন, ঢাকা সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ফলে প্রমাণ করতে পেরেছি, বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী ব্যবস্থাÑ ইভিএমে গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু ভোট সম্ভব নয়। এই নির্বাচনে শতকরা ৭ থেকে ৮ ভোট পড়েছে, সেটিকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। ইভিএমেও যে কারসাজি করা যায় এটি তারই প্রমাণ।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেও ভোট দিতে গিয়ে ফিঙ্গার প্রিন্ট না মেলায় নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়ে তাকে ভোট দিতে হয়েছে। তা হলে তো এ রকম ভোট আরও হয়েছে। আমাদের দুই মেয়রপ্রার্থীর পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি করা গেছে। এখানে আওয়ামী লীগ, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা ইভিএম পরাজিত হয়েছে। সেখানে আমরা জয়ী হয়েছি। আমরা যদি নির্বাচনে অংশ না নিতাম, তা হলে কাউকে বললেও তারা তা বিশ্বাস করত না। আমরা সরকারের স্বরূপ উন্মোচন করতে পারতাম না। ফলে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে নির্বাচনী প্রহসন হচ্ছে, তা উন্মোচন করতেই সামনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির অন্যতম নেতা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ঢাকার সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকাবাসী জানিয়ে দিয়েছে প্রহসনের নির্বাচনে তারা আর ভোট দিতে চান না। এখানে বিএনপির প্রমাণ করার কিছু নেই।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পেছনে তিনটি যুক্তি দেখানো হয়েছে। তা হচ্ছে- প্রথমত মামলা-হামলার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে কোনো কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে টিকে থাকা কঠিন। এ অবস্থায় নির্বাচনে গেলে সরকারবিরোধী বিশেষ করে ২০-দলীয় জোট, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও দেশের সুশীল সমাজসহ গণতান্ত্রিক শক্তিকে একই প্লাটফর্মে আনা সম্ভব হয়। ক‚টনীতিকসহ দেশি-বিদেশি মহলের সঙ্গেও নির্বাচন ইস্যুতে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়, যা অন্য সময় সম্ভব হয় না।

দ্বিতীয়ত, বিএনপি নেতারা মনে করেন দেশে মানুষের গণতান্ত্রিক কোনো অধিকার নেই। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো অবস্থায় বিএনপিকে রাজপথে দাঁড়াতে দেবে না; আবার বিএনপি নির্বাচনে থাক-সেটিও তারা চান নাÑ এটি ক্ষমতাসীনদের একটি কৌশল। সরকারের এই কৌশলের পাল্টা কৌশল হিসেবে নির্বাচনে থাকছে বিএনপি। নির্বাচনে থাকার মধ্য দিয়ে সরকারের স্বরূপ উন্মোচিত করা হবে। তৃতীয়ত এভাবে সব নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারকে আরও অজনপ্রিয় করে দেশে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

গত সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সামনের নির্বাচনগুলোতে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে এক নেতা বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত’। জবাবে আরেক নেতা বলেন, ‘উচিত কথাটার সঙ্গে আমি একমত নই’। একজন সিনিয়র নেতা বলেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে থাকায় আমাকে সরকারের দালাল বলা হয়েছিল’। তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আরেক নেতা বলেন, ‘এখনো আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি, নেতাকর্মী ও দেশের মানুষ আমাদের সরকারের দালাল বলে’। আরেক নেতা বলেন, ‘আমরা তো গ্যাঁড়াকলে পড়েছি, যাওয়া ছাড়া উপায় কী?’ এ সময় হতাশার সুরে সিনিয়র আরেক নেতা বলেন, ‘অবস্থা এমন জায়গায় গেছে, এখন নির্বাচনে না যাওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নিতে পারছি না’।

আলোচনায় যারা

জানা গেছে, নতুন করে যাতে সংকট সৃষ্টি না হয়, সে জন্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন আসন্ন উপনির্বাচনগুলোয় সক্রিয় ও সুস্থ থাকলে তাদেরই মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সে ক্ষেত্রে গাইবান্ধা-৩ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি মঈনুল ইসলাম, বাগেরহাট-৪ এ জেলা বিএনপির সহসভাপতি গাজী খায়রুজ্জামান শিপন এবং ঢাকা-১০ এ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান মনোনয়ন পেতে পারেন। তবে আবদুল মান্নানের শারীরিক সুস্থতার ওপর তার মনোনয়ন নির্ভর করছে। সে ক্ষেত্রে রাজি থাকলে স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে দেখা যেতে পারে। চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসনকে মেয়রপ্রার্থী করা হবে এটি প্রায় নিশ্চিত। তাকে বেশ আগেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিক থেকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া গাইবান্ধা-৩ আসনে আলোচনায় আছেন জিয়া পরিষদের যুগ্ম মহাসচিব রফিকুল ইসলাম ও সাদুল্যাপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শফিউল হাসান, বাগেরহাট-৪ আসনে বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ওবায়দুর রহমান নাসির, ঢাকা-১০ আসনে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম, বিএনপির ঢাকা মহানগরের সহসভাপতি ও ধানমÐি থানার সভাপতি শেখ রবিউল ইসলামের নাম।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত