শনিবার, ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

শরিয়ত বাউল কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই গ্রেপ্তার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য সরকার যথাযথ আইনি সংস্কার ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শরিয়ত বাউল নিশ্চয় কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আজ বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।

সম্পূরক প্রশ্নে জাসদের সাংসদ হাসানুল হক ইনু বাউলগান ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যে স্থান পাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে শরিয়ত বাউলের গ্রেপ্তার হওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, আইসিটি আইনে শরিয়ত বাউলকে গ্রেপ্তার ও ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, বাউলশিল্পীদের চুল কেটে দেওয়া হচ্ছে। গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক শাসকেরা যে জবরদখলের রাজনীতি শুরু করেছিল, তখন যাত্রা, পালাগানসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর একটি আক্রমণাত্মক পরিচালনা করেছিল। তার রেশ এখনো চলছে। ইনু জানতে চান, সরকার বিশ্ব ঐতিহ্যের বাউল সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেবে কি না?

জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই তাঁকে (শরিয়ত) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিবিশেষ অপরাধে সম্পৃক্ত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাউলশিল্পীরা এমন কোনো কাজ যেন না করেন, যার কারণে বাউলগান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাঁরা যেন সেই ধরনের কাজ না করেন। সেই ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকা দরকার আর তাঁদেরও সচেতন করা দরকার।’

শেখ হাসিনা বলেন, বাউলগানের তো কোনো দোষ নেই। কিন্তু বাউলগান যাঁরা করেন, তাঁদের ব্যক্তিবিশেষ কোনো অপরাধে সম্পৃক্ত হলে আইন তার আপন গতিতে চলবে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর সঙ্গে গানের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যাঁরা বাউলগান গাইছেন, তাঁরা সবাই অপরাধের ঊর্ধ্বে-এই গ্যারান্টি কি মাননীয় সংসদ সদস্য দিতে পারবেন? বাউলশিল্পীরা কোনো অপরাধ করেন না বা করেননি-এটা তো ঠিক নয়। নিশ্চয়ই কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তরের পর যারা ক্ষমতায় ছিল, সেখানে গণতান্ত্রিক ধারা ছিল না। সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতায় এসেছে। একের পর এক ক্যু হয়েছে। মিলিটারি ডিক্টেটররা ক্ষমতায় এসেই রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষণা দেয়, ‘আজকের থেকে আমি রাষ্ট্রপতি হলাম।’ আর হয়েই তাদের কাজ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। সুইপারের কাজটাই তারা আগে করে। প্রথমে দেখা যায় রাস্তার পাশে কচুঘেঁচু যা থাকে কেটেকুটে সাফ করে। দেয়াল মুছে পরিষ্কার করে। আবার কেউ সাইকেল চালিয়ে সাশ্রয় করেন। সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি গাড়ি নিয়ে চলে আসছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কেউ কৃচ্ছ্রসাধন করছি বলে টি-শার্ট পরে লেগে গেলেন। কিন্তু দেখা গেল, প্যারিস থেকে স্যুট আসে। ফ্রেঞ্জ-সিপন শাড়ি আছে। তখনকার যুগের দামি এবং ব্র্যান্ড সানগ্লাস “রেমন” পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ রকম বহু নাটক মিলিটারি ডিক্টেটররা করে থাকে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখনো যদি কেউ কিছু করে থাকে, অন্যায়-অপরাধ করলে তা দেখা হবে, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অহেতুক কারও চুল কাটা বা গানের প্রতিবন্ধকতা করা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

মাহফুজুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের মাঝে এই উপলব্ধি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যে সকল নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং কোনো অপরাধীই অপরাধ করে পার পাবে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘শোষণ-বঞ্চনামুক্ত ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার ও সুবিচার সুনিশ্চিত করা আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আধুনিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে ’৭৫-পরবর্তী সময়ে এ দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের মুখোমুখি যাতে হতে না হয়, সে জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার যন্ত্রকারীদের মধ্যে অন্যতম জেনারেল জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকাকালে এই খুনিদের বিভিন্ন বৈদেশিক মিশনে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন। এরপর জেনারেল এরশাদ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বহাল রেখে এই আত্মস্বীকৃত খুনিদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা অব্যাহত রাখে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার কার্যক্রম শুরু করে। একই সঙ্গে শুরু করা হয় জাতীয় চার নেতার জেলাখানার অভ্যন্তরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার। কোনো বিশেষ আইনে অথবা কোনো বিশেষ আদালতে তাদের বিচার করা হয়নি। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে প্রচলিত আইনে হত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং আপিল শুনানি শেষে হত্যাকারীদের সাজা ইতিমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। যেসব সাজাপ্রাপ্ত খুনি বিদেশে পালিয়ে আছে, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার সব প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৪টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ৪১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ৯টি মামলার চূড়ান্ত রায় হয়েছে। ৬টি মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। দুটি মামলা আসামিদের মৃত্যুর কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত করা হয়েছে। একটি মামলায় আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সরকার মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের দুর্নীতির মামলাসহ চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, সিলেটের চাঞ্চল্যকর শিশু রাজন ও খুলনার শিশু রাকিব হত্যা মামলাসহ চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি লাঘবে সঠিক বিচারের নিশ্চয়তা প্রদান করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ধনী-গরিবনির্বিশেষে সবার জন্য সমতার ভিত্তিতে সুবিচার নিশ্চিত করা এবং বিচারব্যবস্থায় দৃশ্যমান উন্নয়ন সাধন করে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আমাদের সরকার বদ্ধপরিকর।’

দানাদার খাদ্যে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ
সরকারি দলের শহীদুজ্জামান সরকারের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আওয়ামী লীগ সরকারের কৃষিবান্ধব কর্মসূচি ও নীতি বাস্তবায়নের কারণেই কৃষি উন্নয়নে সফলতা বাংলাদেশকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে মর্যাদার নতুন আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, আম উৎপাদনে সপ্তম, আলু উৎপাদনে অষ্টম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, সবজি উৎপাদনে তৃতীয় এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মৎস্য আহরণে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দেশ।

সংরক্ষিত আসনের আরমা দত্তের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ৪ হাজার ৫৬৯টি ইউনিয়ন পরিষদে মুজিব শতবর্ষের উদ্বোধন অনুষ্ঠান ছাড়াও বছরজুড়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দেয়ালপত্রিকা, স্মরণিকা প্রকাশ, কুইজ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা ইত্যাদি আয়োজন করা হবে।

সরকারি দলের সাংসদ এবাদুল করিমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসৎ মুনাফাখোর কিছু ব্যবসায়ী মাঝেমধ্যে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণহীন এবং অধিক মুনাফা লাভের চেষ্টা করে থাকে। সরকার এ ব্যাপারে সজাগ আছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত কাউকে চিহ্নিত করা গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শাকসবজি পচনশীল। বিক্রি করতে না পারলে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে নিজ উদ্যোগে বাজারজাত করে। এগুলো যারা তুলে এনে বাজারে দেয়, এগুলো পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করতে হয়, আনা–নেওয়ার খরচ আছে, রাখার খরচ আছে। এভাবে কিছু দাম বেড়ে যায়, এটা স্বাভাবিক।

ছেলেরা কাজ করতে চায় না
সরকারি দলের সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সমবায়, সরকারি, বেসরকারি তিনটিকেই সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমবায়ের মাধ্যমে তরিতরকারি প্রক্রিয়াজাত করার কাজ করা গেলে সুবিধা। প্রক্রিয়াজাত করা থাকলে নারীদের সুবিধা বেশি হয়। কারণ এখন ছেলেমেয়ে সবাই চাকরি করে।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে আসলে ছেলেরা তো কাজটাজ করতে চায় না। হয়তো দুজন একসঙ্গেই অফিসে যায়, অফিস থেকে ফিরলে দেখা যাবে, যে পুরুষ, নিজেকে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করে, সে–ই টায়ার্ড। তখন বলেন, এক কাপ চা দাও তো। আর যিনি মহিলা, চা বানানো, খাবার বানানো—সবকিছু তাঁকেই করতে হয়। আমি এই কথাগুলো বলছি দেখে এখন কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। দুজন যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে সহজ হয়ে যায়।’

Print Friendly, PDF & Email

মতামত