সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাচ্ছেন না ট্রাম্প

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কিনার থেকে ফিরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার তিনি বলেছেন, ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর ইরান তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে।

হোয়াইট হাউস থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত এক ভাষণে এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, দুটি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কোনো আমেরিকান হতাহত হয়নি। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সামান্যই।

তবে তেহরানের বিরুদ্ধে দ্রুতই নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন তিনি। আঘাতের বদলে পাল্টা আঘাতে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি যে আভাস দিয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন ট্রাম্প।

গেল শুক্রবার ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যায় ট্রাম্পের নির্দেশের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সেটা প্রশমিত হয়েছে।

নিউইয়র্কে নাসডাক শেয়ার মার্কেটের সূচক রেকর্ড বেড়ে ৯,১২৯.২৪ হয়েছে।

আগামী নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কংগ্রেসে অভিশংসনের বিচারের মুখোমুখি ও কঠিন পুনর্নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। ইরানের দ্বিতীয় প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে হত্যার পর নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইতে দেখা গেছে এই রিপাবালিকান প্রেসিডেন্টকে।

ট্রাম্প বলেন, নিজ দেশে জাতীয় নায়ক হলেও সোলাইমানি বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাকে বহু আগেই শেষ করে দেয়া উচিত ছিল। শান্তির আহ্বান জনিয়েই নিজের বক্তব্য শেষ করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরানকে কখনোই পরমাণু অস্ত্র নির্মাণের সুযোগ দেবেন না।

২০১৮ সালে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচির লাগাম ধরতে পাঁচ বছর আগে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে সই করা বহুপক্ষীয় চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।

এরপর দেশটির অর্থনীতিকে শেষ করে দিতে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছেন ট্রাম্প। এতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমে অবনতি হতে থাকে।

পশ্চিম ইরাকের বিস্তৃত আইন আল-আসাদ বিমান ঘাঁটি ও ইরবিলের একটি ঘাঁটিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে ইরান। জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদেশি সেনারা এই দুটি ঘাঁটিতে অবস্থান করছেন।

সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়া ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের গালে থাপ্পড় দেয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে আরও আঘাত আসছে বলে তিনি আভাস দিয়েছেন।

টেলিভিশনে দেয়া এক বক্তৃতায় খামেনি বলেন, প্রতিশোধের প্রশ্ন ভিন্ন বিষয়।

ইরাকি সামরিক বাহিনী বলছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রে তাদের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এই হামলা দেশটিকে একটি কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে এ যাবতকালের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে বাগদাদকে।

মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দিয়ে আমেরিকানদের হত্যা করতে চায়নি ইরান বলে যে কথা রটেছে তা উড়িয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাপ্রধান জেনারেল মার্ক মিল্লি।

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যা আমি দেখেছি ও জানি তার উপর ভিত্তি করে আমার মনে হচ্ছে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দিয়ে তারা কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি, যানবাহন-অস্ত্র-বিমান ধ্বংস ও মার্কিন সেনাদের হত্যা করতে চেয়েছে। এটা আমার নিজস্ব মূল্যায়ন।

দুই পক্ষের যুদ্ধের পাদপীঠ হতে যাচ্ছে ইরাক এমন কথা প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট বাহরাম সালেহ।

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেসকে পাঠানো চিঠিতে ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরেও ইরাকের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে সম্মান করে ইরান।

ইরাকের প্রভাবশালী মিলিশিয়ারা ইরানের মিত্র। তারা বলছে, শুক্রবারের ড্রোন হামলার প্রতিশোধ নিতে চায় তারা। সোলাইমানির সঙ্গে দেশটির শীর্ষ মিলিশিয়া কমান্ডার আবু মাহদি আল-মুহান্দিসও ওই হামলায় নিহত হয়েছেন।

ইরাকের সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করে নেয়া হাশেদ আল-শাবি সামরিক নেটওয়ার্কের উপপ্রধান ছিলেন মুহান্দিস। এই নেটওয়ার্কের শাখা কাতাইব হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিচ্ছে ইরান।

গেল বুধবারে ইরাকের অতি সুরক্ষিত গ্রিন জোনে অজ্ঞাত বাহিনীর দুটি রকেট এসে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের দূতাবাস অবস্থিত।

ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে ইরানের ঔদ্ধত্য ছিল অদ্ভুত। বিপুল জনতার সামনে সোলাইমানির দাফন শেষে ইরান হামলা চালাল। যে কোনো কিছুর চেয়ে এটা প্রতীকী আঘাতই হবে বলা যায়।

হামলায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ সন্তোষ প্রকাশের আভাস দিয়েছেন। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, আত্মরক্ষায় ইরান সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে এবং শেষ করেছে।

তবে ট্রাম্পের নিজদেশের বিরোধীদের মন্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করে দিতে বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের আয়োজন করা হয়েছে।

হাউস স্পিকার ন্যানসি পেলোসি বলেন, আমেরিকান লোকজনকে নিরাপদ রাখতে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে আনতে ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো সঙ্গতিপূর্ণ কৌশল নেই, তা পরিষ্কার করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার বলেন, সোলাইমানি হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে কিছু বাধা তারা কাটিয়ে উঠেছেন। কিন্তু আমরা দেখছি, সময়ই সব বলে দেবে।

ইরানের সঙ্গে পরিস্থিতির উত্তেজনা কমিয়ে আনলেও ইরাকে অবস্থান করা পাঁচ হাজার ২০০ মার্কিন সেনার ওপর দিয়ে চাপ কমছে না। সেখানে তাদের ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়া ও রাজনৈতিক বিরোধীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

আধা সামরিক বাহিনীর প্রধান কয়েস আল-খাজা আলীকে মার্কিন সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান যে জবাব দিয়েছে, তাদের প্রতিরোধ তার চেয়ে কম হবে না।

কিন্তু মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলেন, উৎসাহিত হওয়ার মতো কিছু গোয়েন্দা তথ্য আমরা পেয়েছি যে ওইসব মিলিশিয়াদের ইরান বার্তা দিয়েছে, যাতে তারা আমেরিকান লক্ষ্যবস্তু কিংবা বেসামরিক লোকদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেয়।

মার্কিন ড্রোন হামলায় ক্ষোভ জানিয়ে ইরাক থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহারে প্রস্তাব পাশ করেছে ইরাকের প্রতিবেশী দেশটি। কীভাবে তার জবাব দেবে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত