সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

আওয়ামী লীগের কমিটিতে বড় পরিবর্তন আসছে

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন শুরু হচ্ছে আজ। টানা নবমবারের মতো দলের সভাপতি হতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলন উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, আওয়ামী লীগের দলীয় ও সভাপতির কার্যালয় ছাপিয়ে নগরীর রাস্তায়ও সাজ সাজ রব। তুমুল ব্যস্ততা চারদিকে। কেন্দ্রীয় নেতাদের চোখে ঘুম নেই, আছে উৎকণ্ঠা। উৎসবের সম্মেলন ঘিরে চাপা উত্তেজনায় শেষ মুহূর্ত পার করছেন তাঁরা। কারণ, নতুন কমিটিতে কে আসছেন, কে বাদ পড়ছেন—কোনো আভাস নেই কারও কাছে।

আওয়ামী লীগের দুজন উচ্চপর্যায়ের নেতা বলেন, গত সম্মেলনের তিন দিন আগেই পরবর্তী সাধারণ সম্পাদকের নাম জানা গিয়েছিল। এবার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তবে ওবায়দুল কাদেরই টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন বলে তাঁদের ধারণা। এর বাইরে কারা থাকবেন, কারা বাদ পড়বেন, সেই শঙ্কায় আছেন অধিকাংশ নেতা। গত বুধবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির শেষ বৈঠকেও নতুন কমিটি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
এর আগে নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ছয়টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনেও ঘোষণার আগে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে কেউ আঁচ করতে পারেননি। শুধু যুবলীগের চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ ফজলে শামসের নাম দুদিন আগেই জানা যায়। এবার সম্মেলনের তিন মাস আগে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু করে সরকার। এতে অনেক নেতা বহিষ্কৃত হয়েছেন, অব্যাহতি পেয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন। এরপর অনুষ্ঠিত জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগের শীর্ষ পদগুলোতে নতুনদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের দায়িত্বও পেয়েছেন নতুন চারজন। এখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেও বাদ পড়ার আশঙ্কায় আছেন অর্ধেক নেতা। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দলীয় কার্যালয়ে ভিড় করছেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা।

কয়েক দিন ধরে সভাপতিমণ্ডলীর দুজন সদস্য, দুজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, চারজন সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিনজন সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা বলছেন, বাদ পড়া ও রদবদল মিলে বড় পরিবর্তনের আভাস আছে দলের ভেতরে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী কেউ নতুন করে দলে জায়গা পাবেন না। সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্য থেকে অনেকেই ঢুকতে পারেন এবার। বিতর্কিত ও নিষ্ক্রিয়রা নিশ্চিতভাবেই বাদ পড়বেন। বয়স বিবেচনায় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের একটি বড় অংশ এবার বাদ পড়তে পারে। তাদের জায়গা হতে পারে উপদেষ্টা পরিষদে। উপদেষ্টা পরিষদ ইতিমধ্যেই ৪১ থেকে বাড়িয়ে ৫১ করা হয়েছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া ১৭ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সম্পাদকদের মধ্য থেকে কেউ কেউ জায়গা পাবেন। বর্তমান কমিটিতে ১৫ জন নারী থাকলেও আগামী কমিটিতে বাড়তে পারে। সম্পাদকীয় এবং নির্বাহী সদস্য পদেও আসতে পারে বড় ধরনের রদবদল।

আওয়ামী লীগের সম্মেলন আজ। নবমবারের মতো সভাপতি হচ্ছেন শেখ হাসিনা। সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

এ বিষয়ে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং অভ্যর্থনা কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাসিম বলেন, নতুন দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ভবিষ্যতে যেকোনো পরিস্থিতিতে দলকে সুসংহত রাখতে পারার মতো দক্ষ নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হবে সম্মেলনে। বিদেশি কূটনৈতিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ জামায়াতে ইসলামী ছাড়া সব রাজনৈতিক দলকেই সম্মেলনে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নেতৃত্ব নির্ধারণ শনিবার
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ শুক্রবার বেলা তিনটায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় সাড়ে সাত হাজার কাউন্সিলর, সাড়ে সাত হাজার প্রতিনিধি ও অতিথিসহ ৫০ হাজার মানুষের উপস্থিতি হতে পারে সম্মেলনে। কাউন্সিল অধিবেশন ২১ ডিসেম্বর শনিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যেই তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। তবে ভোটাভুটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন একাধিক নেতা। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একক প্রার্থীর প্রস্তাব ওঠার মধ্য দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারেন শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের। এরপর ৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বড় অংশ একই দিনে ঘোষণা করা হতে পারে।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫ সালের সম্মেলনে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। এই দলটির বয়স ৭০ বছর। এর আগে ২০টি জাতীয় সম্মেলন হয়েছে। সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছে ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ওই সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

গণফোরাম ছাড়া অন্যরা আগ্রহী নয়
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই সবার দাওয়াত কার্ড পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে সরকার-সমর্থিত মহাজোটের বাইরে থাকা দলগুলোর অধিকাংশই সম্মেলনে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী নয়।

গতকাল সকালে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গিয়ে সম্মেলনের দাওয়াত দেওয়া হয়। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ ও মির্জা আব্বাসকে দাওয়াত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বিএনপি। তবে বিএনপির কেউ যাচ্ছেন না।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘দাওয়াত পেয়েছি। সাধারণ সম্পাদক, সভাপতিও পেয়েছেন। যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ড. কামাল হোসেন দেশের বাইরে আছেন, গতকাল রাতে তাঁর ফেরার কথা ছিল।’ সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম দাওয়াত পাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা সম্ভবত যাচ্ছি না।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না দাওয়াতপত্র পাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, ‘এখনো কিছু ভাবিনি। অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’

গুরুত্ব পাচ্ছে সরকারের উন্নয়ন
‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে গড়তে সোনার দেশ, এগিয়ে চলেছি দুর্বার, আমরাই তো বাংলাদেশ’। এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়নের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। আওয়ামী লীগের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্রসংবলিত ফেস্টুন ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। উন্নয়নের স্মারক হিসেবে পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবয়ব থাকছে সম্মেলনের মূল মঞ্চে।

জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধনের পর ২৫ মিনিটের একটি উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করা হবে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দলের বিভিন্ন চড়াই-উতরাইয়ের কথা তুলে ধরা হবে। এ ছাড়া গত ১১ বছরে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।

সাংগঠনিক প্রতিবেদন
আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদনে আট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের জমা দেওয়া প্রতিবেদন তুলে ধরা হবে। এ প্রতিবেদন বলছে, সারা দেশে ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে বর্তমান কমিটির মেয়াদে ৩১টি জেলায় নতুন করে সম্মেলন হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কিছু জেলায় আগের মেয়াদে সম্মেলন হলেও কমিটি অনুমোদন হয়েছে এবার।

খুলনা বিভাগে ৭টি জেলা ও ৪১টি উপজেলার সম্মেলন হয়েছে। রংপুর বিভাগে ৯টি জেলার মধ্যে ৬টি সম্মেলন করেছে। রাজশাহী বিভাগে শুধু বগুড়া ও রাজশাহী জেলা কমিটি হয়েছে এ মাসে। বরিশাল বিভাগে ৭টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে তিনটিতে সম্মেলন হয়েছে। ঢাকা বিভাগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং গোপালগঞ্জ জেলার সম্মেলন হয়েছে। তবে একাধিক জেলার কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে বর্তমান মেয়াদে। ময়মনসিংহ বিভাগের পাঁচটি জেলার কোনোটিতে সম্মেলন না হলেও ৩৯টি উপজেলার সম্মেলন হয়েছে। সিলেটের পাঁচটির মধ্যে চারটিতে সম্মেলন হয়েছে। চট্টগ্রামে ৬টি জেলা ও ২৮টি উপজেলার সম্মেলন হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত