শনিবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

কুষ্ঠরোগীদের দেখে দূর-দূর ছেই ছেই করবেন না : প্রধানমন্ত্রী

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কুষ্ঠরোগীদের দেখে দূর-দূর ছেই ছেই করবেন না। তাদের আলাদা করে রাখবেন না। এটা অভিশাপ নয়, চিকিৎসা দিলে এরাও ভালো হয় এবং সুস্থ জীবনে ফিরে যায়। এটা আমি প্রমাণ করেছি। কুষ্ঠরোগীদের সেবা দেয়া, সহায়তা করা এবং সহানুভূতির সঙ্গে তাদের দেখার জন্য অনুরোধ জানাই।

বুধবার হোটেল সোনারগাঁওয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কুষ্ঠরোগ মুক্ত করার বিষয়ে আয়োজিত জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার স্বামীর চাকরির সুবাদে আমি যখন মহাখালী কোয়াটারে থাকতাম তখন সেখানে বেশ কিছু কুষ্ঠরোগী আসতো। আমি তাদের খেতে দিতাম এবং টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতাম। আবার যখন বিরোধীদলীয় নেতা ছিলাম এবং মিন্টো রোডে বসবাস করতাম তখনও সেখানে কুষ্ঠরোগী যেত। তাদেরও সাহায্য করতাম। প্রথম প্রথম অনেকে তাদের কাছে যেত না, তারপর আমি যখন যাওয়া শুরু করলাম তখন সবাই যাওয়া শুরু করল। তখন থেকেই ভাবতাম কোনোদিন ক্ষমতায় গেলে কুষ্ঠরোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করব।

শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর এই কুষ্ঠরোগীদের জন্য গাজীপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্প করা হলো। ৭০টি পরিবারকে সেখানে আশ্রয় দেয়া হলো। সরকারির পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও অনেকে এগিয়ে এল। সেখানে বসবাস করা অনেকেই এখন রোগমুক্ত হয়েছে। তারা এখন সমাজের অন্য মানুষের সঙ্গে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তাদের এখন আর ভিক্ষাবৃত্তি করতে হচ্ছে না। তারা এখন আর অবহেলার পাত্র নয়।

তিনি বলেন, ২০৩০ সাল লাগবে না তার আগেই আমরা বাংলাদেশকে কুষ্ঠরোগ মুক্ত করব ইনশাআল্লাহ।

কুষ্ঠরোগীদের জন্য ওষুধ তৈরি এবং তা বিনা পয়সায় সরবরাহ করতে দেশের ওষুধ কোম্পানির মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কুষ্ঠরোগীদের কাউকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না। রোগ দেখা দিলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। কুষ্ঠরোগের সিমটম সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তা প্রচার করার জন্য আহ্বান জানান তিনি।

চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, কুষ্ঠরোগ হওয়ার আগে কি কি সিমটম দেখা দেয়, সেগুলো যদি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার করা যায় এবং রোগ শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে যদি চিকিৎসা দেয়া যায় তাহলে তারা ভালো হয়ে ওঠবে এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা তৈরির জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরা আমাদের সমাজেরই একজন। কুষ্ঠরোগীদের দূরে ঠেলে দেবেন না, তাদের সহানুভূতির সঙ্গে দেখা এবং এমনভাবে চিকিৎসা করা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে আমরা সরকারে আসার পরে এই কুষ্ঠরোগ নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি এবং তার সুফল আমরা পেয়েছি ৯৮ সালের মধ্যে। ১০০০ জনের মধ্যে মাত্র একজন কুষ্ঠরোগী নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমাদের এমডিজি ২০০০ সালে অর্জন করার কথা ছিল, সেটা কিন্তু আমরা ৯৮ সালে অর্জন করে ফেলেছিলাম। আমরা সার্ভে করে দেখেছি, এ রোগটা কিন্তু সব এলাকায় সমান নয় । কিছু কিছু এলাকায় বেশি দেখা যায়। যেমন উত্তরবঙ্গ ও পার্বত্য চট্টগ্রামে।

‘কুষ্ঠরোগীদের থাকা-খাওয়া, ওষুধপত্র সব কিছুর ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু সরকার নয় সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে ২০৩০ সাল লাগবে না তার আগেই আমরা বাংলাদেশকে কুষ্ঠরোগ মুক্ত করতে সক্ষম হব। এটা আমার বিশ্বাস।’

তিনি বলেন, আমাদের দেশে পলিও এবং হাম এক সময় বিরাট একটা সমস্যা ছিল। সেগুলো কিন্তু আমরা আস্তে আস্তে দূর করেছি। বাংলাদেশ পারবে না এটা ঠিক না আমি মনে করি আমরাও পারব।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো যে ওষুধ তৈরি করে তা অত্যন্ত মানসম্পন্ন এবং এগুলো বিদেশে রফতানি করা হয়। বিদেশেও বাংলাদেশের ওষুধের সুনাম আছে। তারা যদি কুষ্ঠরোগের জন্য ওষুধ তৈরি করেন এবং বিনা পয়সায় বিতরণ করেন তাহলে তারা একটি ভালো সেবা পাবে। আমি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর মালিকদের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে আলোচনা করব। এ বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থা যেমন বেসরকারি সংস্থা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে এর ফলে মানুষ লাভবান হচ্ছে।

তিনি বলেন, কারও কুষ্ঠরোগ দেখা গেলে তাকে চাকরিচ্যুত করতে হবে, চাকরি থেকে বের করে দিতে হবে, সমাজচ্যুত করতে হবে, এই মানসিকতা বদলাতে হবে। এটা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে। কারও যদি কুষ্ঠরোগ দেখা যায় তাকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না। তাকে সমাজচ্যুত করা যাবে না। তাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যে অফিসে চাকরি করবে তাদেরই একটা দায়িত্ব থাকবে তারা যেন সঠিকভাবে তার চিকিৎসা করে। তিনি যেন সুষ্ঠু চিকিৎসা পায় এবং এর ফলে যেন পঙ্গুত্ববরণ না করে তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কোম্পানির। সে অনুরোধটাও আমি সবাইকে করে যাচ্ছি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম, নিপপন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়া।

স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে কুষ্ঠরোগের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত