শুক্রবার, ১লা অক্টোবর, ২০২০ ইং

সরকারের হস্তক্ষেপেই জামিন হয়নি খালেদা জিয়ার: ফখরুল

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণেই খালেদা জিয়ার জামিন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার (০৫ ডিসেম্বর) দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘খালেদা জিয়া সন্ত্রাসের গডমাদার, আগে থেকেই হুইল চেয়ারে আছেন, দেশের বাইরে নি’ রিপ্লেসমেন্ট করিয়েছেন’—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলে একদিকে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ, যারা স্বাধীনভাবে মেডিকেল রিপোর্ট দেবেন, তাদেরকে ভয়-ভীতি দেখিয়েছেন।’’

তিনি বলেন, ‘আমি ভয়-ভীতির ওপর জোর দিচ্ছি এই জন্যই যে, পুরোপুরি ফ্যাসিবাদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হচ্ছে ভীতি প্রদর্শন। আরও একটি ঘটনা আছে- কাকতালীয় কী না জানি না! গতকালই সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। একদিকে সাবেক প্রধান বিচারপতির মামলার চার্জশিট প্রদান, আরেক দিকে প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি।’

‘আমরা পরিষ্কার করে বলতে পারি, এটা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ওপর এবং বিএসএমএমইউ চিকিৎসকদের ওপর সরারসরি হুমকি। সরকারের এই ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণেই খালেদা জিয়া জামিন পাননি— বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্টের ওপরই খালেদা জিয়ার জামিন হওয়ার কথা উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘অসমর্থিত একটি সূত্রে আমরা জানি যে, গত রাতেই রিপোর্ট চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে তার জামিনকে বাধা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘গতকাল প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে পরিষ্কার হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এই বিচারকাজে হস্তক্ষেপ করছেন। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সরাসরি বিচারবিভাগের ওপর হস্তক্ষেপের শামিল এবং আদালত অবমাননার শামিল। এই ধরনের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে যে, তিনি এবং তার সরকার চায় না যে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পাক।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের রিপোর্ট না পেয়ে আদালত জামিন আবেদন শুনানি ১২ ডিসেম্বর নির্ধারণ করায় সমগ্র জাতি কেবল হতাশই হয়নি, বিক্ষুব্ধ হয়েছে। আমরা দীর্ঘ বিশ মাস ধরে অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে এবং উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি যে, একজন সাধারণ নাগরিক যেটুকু সুযোগ সুবিধা পান, খালেদা জিয়াকে সেটুকু দেওয়া হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে যে মামলায়, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সে মামলায় সাত দিনের মধ্যে জামিন পাওয়া উচিত। কিন্তু প্রায় বিশ মাস হয়ে গেল, তাকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না এবং বিভিন্নভাবে তার ওপর অত্যাচার, নির্যাতন করা হচ্ছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তিন বার তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন জনগণের সরাসরি ভোটে। দুইবার বিরোধী দলের নেত্রী ছিলেন। ৭৩ বছর বয়সী এই জনপ্রিয় নেতাকে জামিন না দেওয়াটা প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধেই শুধু নয়, অমানবিকতাও বটে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী বিএসএমএমইউ’র ভিসি দুইটি রিপোর্ট আদালতে উপস্থাপনে বাধ্য ছিলেন। আমরা মনে করি, আজকে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ এসব রিপোর্ট উপস্থাপন না করে আদালত অবমাননা করেছেন।’

সাংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বচন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, আমির খসরু মাহমদু চৌধুরী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাংগঠনিক সম্পাদক হেলেন জেরিন খান প্রমুখ।

এর আগে সকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় সদস্যের বেঞ্চে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি শুরু হয়। এসময় দুপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয়। শেষমেষ এজলাস ছেড়ে চলে যান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।

শুনানির শুরুতে অ্যাটর্নি জেনারেল মেডিকেল রিপোর্ট এবং শুনানির জন্য দুই সপ্তাহ সময় চান আদালতের কাছে। আদালত আগামী ১১ ডিসেম্বর মধ্যে মেডিকেল রিপোর্ট দাখিল এবং শুনানির জন্য ১২ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় দেন।

এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বৃহস্পতিবারের (৫ ডিসেম্বর) মধ্যেই শুনানি করতে চাইলে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উচ্চবাচ্য শুরু হয়। জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘খালেদা জিয়ার অবস্থা খুবই খারাপ, আগে তার জামিন দেন, প্রয়োজনে শুনানি পরে হোক।’

তখন আদালত জানান আগামি বৃহস্পতিবার শুনবেন। এরপর বিএনপির আইনজীবীরা কোর্টে আবার উচ্চবাচ্য শুরু করেন।

কয়েক মিনিট ধরে এই অবস্থা চলার পর আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতিসহ ছয় জন বিচারপতি এজলাস ছেড়ে খাস কামরায় চলে যান। এ সময় আদালতে উপস্থিত বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা শেইম শেইম বলে চিৎকার করতে থাকেন।

কোর্ট উঠে চলে গেলেও আইনজীবীরা কেউ কারও জায়গা ছাড়েনি, যে যার জায়গায় বসে আছেন। বন্ধ রয়েছে বিচারিক কাজ। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা, দুদকের পক্ষে ছিলেন খুরশীদ আলম খান।

এছাড়া খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দীন সরকার, খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নুল আবেদীন, এ জে মোহাম্মদ আলী, মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ বিএনপির শতাধিক আইনজীবী।

এর আগে, গত বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা করেন পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক ড. মো. আকতারুজ্জামান। রায়ে খালেদা জিয়া ছাড়া অপর তিন আসামিকেও সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া আপিল করলে ৩০ এপ্রিল তা শুনানির জন্য গ্রহণ করে অর্থদণ্ড স্থগিত করেন হাইকোর্ট।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত