বুধবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

আদালতে বিএনপির আইনজীবীদের হট্টগোল, এজলাস ছাড়লেন প্রধান বিচারপতি

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি শুরু হলে দুপক্ষের আইনজীবীদের তুমুল হট্টগোলে এজলাস ছেড়ে চলে যান প্রধান বিচারপতি।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় সদস্যের বেঞ্চে এই শুনানি শুরু হয়।

শুনানির শুরুতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের বরাত দিয়ে আদালতকে জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাকি আছে, সেগুলো করতে সময় লাগবে। খালেদা জিয়ার মেডিকেল প্রতিবেদন এবং শুনানির জন্য দুই সপ্তাহ সময় প্রার্থনা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। আদালত আগামী ১১ ডিসেম্বর মধ্যে মেডিকেল প্রতিবেদন দাখিল এবং শুনানির জন্য ১২ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় দেন।

এসময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনসহ অন্যরা আজকের মধ্যেই শুনানি করার দাবি জানান। এসময় দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে চরম উচ্চবাচ্য শুরু হয়। জয়নুল আবেদীন বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ, আগে তার জামিন দেন, প্রয়োজনে শুনানি পরে হোক। তিনি খালেদা জিয়ার অন্তবর্তী জামিন প্রার্থনা করেন। এর বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত খালেদা জিয়া জামিন চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেছিলেন। এই আবেদনের শুনানিতে গত ২৮ নভেম্বর আদালত খালেদা জিয়ার সবশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে জানাতে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে বোর্ডের মেডিকেল প্রতিবেদন ৫ ডিসেম্বরের (আজ) মধ্যে আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর আগে গঠিত আরেকটি মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদনও দাখিল করতে বলেছিলেন আদালত।

আজ ধার্য তারিখে বিষয়টি শুনানির জন্য উঠলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল। কিছু পরীক্ষা শেষে প্রতিবেদন দিতে হবে বলে তাঁকে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ জন্য সময় দরকার।

তখন খালেদা জিয়ার পক্ষের আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, আগের একটি রিপোর্ট আছে। শুনানি হতে পারে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ওই রিপোর্ট আমাদের দেওয়া হয়নি।

পরে রিপোর্টটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে দেখানো হয়। তখন তিনি বলেন, এটা গোপনীয়। এটা কীভাবে বাইরে আসে।

জয়নুল আবেদীন বলেন, বোর্ড হয়েছে। খালেদা জিয়ার অবস্থা খারাপ। চিকিৎসার জন্য তাঁকে বাইরে নেওয়া দরকার।

অ্যাটর্নি জেনারেল ওই বোর্ডের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, অথোরিটি হচ্ছে বিএসএমএমইউয়ের উপাচার্য। তিনি বলেছেন, টেস্ট শেষে রিপোর্ট দিতে পারবেন। সময় লাগবে।

তখন জয়নুল আবেদীন বলেন, বোর্ড তো আমরা করিনি।

এ অবস্থায় জয়নুল আবেদীন গত ২৮ নভেম্বরের আপিল বিভাগের আদেশ পড়ে শোনান। ওই আদেশে গত ৭ অক্টোবরে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন দাখিলের কথাও রয়েছে।

জয়নুল আবেদীন বলেন, মানবিক আবেদন, জীবন রক্ষার জন্য জামিন দেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ইমোশনাল কথা বলবেন না।

এই কথায় আপত্তি জানান জয়নুল আবেদীন।

খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেন, এত দুঃসাহস পেলেন কোথায়? সর্বোচ্চ আদালত আদেশ দিয়েছেন।

খোকনের এই বক্তব্যে আপত্তি জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

প্রধান বিচারপতি বলেন, রিপোর্ট আসুক। বিষয়টি আগামী বৃহস্পতিবার থাকবে।

জয়নুল আবেদীন বলেন, দীর্ঘ সময়। ইনজাস্টিস হবে। সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি আস্থা আছে, সে জন্য বলছি।

প্রধান বিচারপতি বলেন, এ জন্য আমরা রিপোর্ট কল করেছি।

জয়নুল আবেদীন বলেন, রিপোর্ট আসা ২৪ ঘণ্টার বিষয়। খালেদা জিয়ার অবস্থা খুবই খারাপ।

এ অবস্থায় আদালত বলেন, বিষয়টি বৃহস্পতিবার থাকবে। একসঙ্গে দুটি রিপোর্ট দেখা হবে।

জয়নুল আবেদীন বলেন, খালেদা জিয়া অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় আছেন। আদালত চাইলে তাঁকে হাজির করে দেখতে পারেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, সব হবে। আগে রিপোর্ট আসুক।

জয়নুল আবেদীন বলেন, সোমবার করুন।

তখন খোকন বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের অ্যাডভাইসে রিপোর্ট আসেনি।

এ সময় উপস্থিত আইনজীবীদের মধ্যে হইচই শুরু হয়।

একপর্যায়ে আদালত বলেন, চিৎকার করলে শুনব কী করে।

বিএনপির আইনজীবীরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, জামিন চাই, জামিন চাই।

এ অবস্থায় আদালত আদেশ দেন।

আদালতের আদেশ দেওয়ার পরও হইহই চলে। পরে এজলাস ত্যাগ করেন বিচারপতিরা।

এরপরও উভয় পক্ষের আইনজীবীদের আদালতে অবস্থান করতে দেখা যায়।

তখন আদালত জানান আগামী বৃহস্পতিবার শুনানি হবে। এরপর বিএনপির আইনজীবীরা কোর্টে হট্টগোল শুরু করেন।

কয়েক মিনিট ধরে তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলার পর আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতিসহ ছয় জন বিচারপতি এজলাস ছেড়ে খাস কামরায় চলে যান। এসময় আদালতে উপস্থিত বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা শেইম শেইম বলে চিৎকার করতে থাকেন।

কোর্ট উঠে চলে গেলেও আইনজীবীরা কেউ কারও জায়গা ছাড়েননি, যে যার জায়গায় বসে আছেন। তারা জামিন শুনানি না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান নেয়ার কথা বলছে। দুপক্ষের আইনজীবীদের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে বন্ধ রয়েছে বিচারিক কাজ।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা, দুদকের পক্ষে ছিলেন খুরশীদ আলম খান।

আর খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দীন সরকার, খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নুল আবেদীন, এ জে মোহাম্মদ আলী, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সগীর হোসেন, ব্যারিস্টার মীর হেলাল, রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ বিএনপির শতাধিক আইনজীবী।

গত বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ে খালেদা জিয়াকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়। এই সাজা বাতিল চেয়ে গত বছরের ১৮ নভেম্বর হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। শুনানি নিয়ে গত ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট ওই আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতে দেওয়া জরিমানার আদেশ স্থগিত করে বিচারিক আদালতে থাকা মামলাটির নথি তলব করেন হাইকোর্ট। গত ২০ জুন মামলার নথি হাইকোর্টে আসার পর খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন আদালতে তুলে ধরেন তাঁর আইনজীবীরা। গত ৩১ জুলাই জামিন আবেদন খারিজ করেন হাইকোর্ট। পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আপিল বিভাগে যান।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত