শুক্রবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

প্রয়োগ-প্রচার নেই নতুন সড়ক আইনের

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

নতুন সড়ক আইন কার্যকরের ঘোষণা দিলেও দুইদিনে চোখে পড়েনি এর কোনো প্রয়োগ। আইন কার্যকরের প্রথম দু’দিন ছুটি থাকায় রাজধানীর সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ কম রয়েছে। আবার অনেকেই নানা আশঙ্কায় গাড়ি বের করেননি। এদিকে পরিবহন খাতের বড় দুই সংগঠন আইনটি নিয়ে তাদের মতামত বিবেচনার পর তা প্রয়োগের দাবি জানাচ্ছে।

শনিবার (২ নভেম্বর) ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে এ আইনাটি প্রয়োগ করা হবে। এখন কেবল লিখিত প্যাডে আইনটির কিছুটা প্রয়োগ শুরু করেছি আমরা। ট্রাফিক পুলিশের পজ মেশিনসহ (পয়েন্ট অব সার্ভিস) আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো আপডেট করার প্রক্রিয়া চলছে।’

ট্রাফিক পুলিশ এখনও এ আইনটি নিয়ে মোটিভেশোল পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকেই এ বিষয়ে অবগত না হওয়ায় তাদের নতুন আইন সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ‘আইনটি নিয়ে ব্যাপক প্রচার দরকার। তাছাড়া প্রয়োগের আগে অবকাঠামোগত বিষয় ঠিক করতে হবে। হঠাৎ প্রয়োগ করতে গেলে জটিলতার মুখে পড়তে হবে।’
বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘দণ্ডের দিক থেকে আইনটি যুগোপযোগী হয়েছে। কিন্তু প্রয়োগের আগে প্রচার-প্রচারণা দরকার আছে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) পরিচালক শেখ মোহম্মদ মাহবুব-ই রাব্বানী বলেন, ‘আইনটি কার্যকর হয়ে গেছে। এখন থেকে অভিযানও চলবে। তবে প্রথমদিকে সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। যাতে চালক মালিক পথচারী কারও ওপর বেশি চাপ না পড়ে। এ আইন সম্পর্কে এখনও ঠিকমতো জানেন না যাতায়াতকারী কিংবা পুলিশ। আইন কার্যকরের প্রথম দিনে প্রতিদিনের মতোই অনিয়ম চোখে পড়েছে।’

এদিকে আইন কার্যকরের বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সড়ক পরিবহন খাতের দুই বড় সংগঠন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এ দুই সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে চলে সারাদেশের বাস ট্রাক। দুই সংগঠন এখনই এ আইন প্রয়োগ চায় না। তাদের মতামত নিয়ে আইনের সংশোধনের দাবি তুলেছেন ফেডারেশন ও সমিতির শীর্ষ নেতারা।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, আইনটি নিয়ে তারা কিছু সংশোধনের প্রস্তাব করেছিলেন। যা গৃহীত হয়। কিন্তু হঠাৎ করে কার্যকরের পর তারা দেখতে পান কোনো সংশোধন হয়নি। তাছাড়া আইন প্রয়োগের আগে যে বিধি প্রণয়ন করার কথা সে বিধি প্রণয়ন হয়নি।’ এ অবস্থায় আইন প্রয়োগ করা যাবে না বলে মনে করেন খন্দকার এনায়েত উল্লাহ

এর আগে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি শাজাহান খান জানিয়েছিলেন, আইনটি ভেটিংয়ের সময় মালিক ও শ্রমিকরা কয়েকটি বিধান সংশোধনের প্রস্তাব করেছিলেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কিছু গ্রহণ করা হয়, আবার কিছু গ্রহণ করা হয়নি। আইনটি পাস হওয়ার পর দেখা যায়— আইনের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে।

শাজাহান খান বলেন, আমরা বিষয়গুলো সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দৃষ্টিতে আনি। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেন। কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করে আমাদের কয়েকটি প্রস্তাবের যৌক্তিকতার সঙ্গে একমত পোষণ করেন।’

৭৯ বছরের পুরনো মোটরযান অধ্যাদেশ বাতিল করে গত ১ নভেম্বর থেকে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়েছে। এ আইনে বেপরোয়া গাড়ি চালকের কারণে মৃত্যু হলে ৫ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। যদি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে চালক বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটায়, তাহলে সর্বোচ্চ সাজা হবে ফাঁসি।

নতুন সড়ক আইনে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ছাড়া কর্তৃপক্ষের দেওয়া যে কোনো লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট দেওয়া থাকবে। দোষ করলে তা কাটা যাবে। লালবাতি অমান্য, ওভারটেক, গতিসীমা অমান্য, বিপরীত দিক থেকে গাড়ি চালানো, ওজনসীমা লংঘন, নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালালে পয়েন্ট কাটা যাবে চালকের। এ বিধান আগে ছিল না।

নতুন আইনে নিয়োগপত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তিকে গণপরিবহনের চালক নিয়োগ করতে পারবে না। নিয়োগপ্রাপ্ত চালক তার কাগজপত্র গাড়িতে প্রদর্শন করবেন। এ ছাড়া কন্ডাক্টর লাইসেন্স ছাড়া কন্ড্রাক্টর নিয়োগ করা যাবে না বলে বিধান করা হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আগে এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল চার মাসের কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে অনধিক ছয় মাসের জেল বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালালে ছয় মাসের জেল বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।

গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় গড়ে উঠা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইনটি জাতীয় সংসদে পাস হয়। কিন্তু এর বিরুদ্ধে পরিবহন মালিক শ্রমিকরা আইনটি সংশোধনের জন্য তৎপর হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় আইন কার্যকরের ঘোষণা দেয়।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত