সোমবার, ২০শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং

এখনো ধরা ছোয়ার বাইরে জি কে শামীম ঘনিস্ট গণপূর্তের সেভেন স্টার প্রকৌশলী গ্রুপ

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

টেন্ডারবাজি, অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসাসহ নানা অভিযোগে জি কে শামীম ও যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাট গ্রেফতার হলেও এখনো ধরা ছোয়ার বাইরে রয়ে গেছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরে তাদের সহযোগী প্রকৌশলীরা। এই প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে গত ২৫ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গণপূর্ত অধিদপ্তরে জি কে শামীম ও স¤্রাটের সহযোগী হিসেবে সেভেন স্টার প্রকৌশলী গ্রুপ এর নামে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়। কিন্তুু কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারিরা।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয় এই সেভেন স্টার প্রকৌশলী গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে যুবলীগ নেতা জিকে শামীম, ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে বড় বড় প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে সহায়তা করত। এর বিনিময়ে তারা পেতেন ১ থেকে ২ শতাংশের কমিশন। গুনে গুনে নিতেন বিশাল অঙ্কের ঘুষের টাকা। আর এসবই করতেন ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত সাত উপসহকারী প্রকৌশলী। যারা গণপূর্তের সবার কাছে সেভেন স্টার গ্রুপ নামে পরিচিতি লাভ করেছেন। এই সেভেন স্টার গ্রুপের সদস্যরা হলেন জাতীয় সংসদে কর্মরত উপসহকারী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম, মিজানুর রহমান প্রধান, আতাউর রহমান, নওশাদুল হক, আসাদুজ্জামান লিপটন, আশরাফ ও হুমায়ুন কবির। এই সাত উপসহকারী প্রকৌশলীকে গণপূর্তের কর্মকর্তারা এক নামেই ‘সেভেন স্টার গ্রুৃপ’ হিসেবে চিনে থাকেন।

সময়ের আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সাত উপসহকারী প্রকৌশলীর রয়েছে নিজস্ব গাড়ি, প্লট ও ফ্ল্যাট। এদের কারও রয়েছে জমি, মাছের ঘের, ঠিকাদারি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও। তারা এতটাই প্রভাবশালী যে, কোন কর্মকর্তার বদলি কোথায় করা হবে তাও ঠিক করেন এবং সাবেক ও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করে জিকে শামীম ও খালেদ ভূঁইয়াকে প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কাজটি করেন। এই গ্রূপের প্রধান ভূমিকা পালন করেন আমিনুল ইসলাম নামে এক উপসহকারী প্রকৌশলী। তারা ঢাকায় গণপূর্তের উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে প্রায় ১০-১৫ বছর ধরে চাকরি করছেন। কোনোভাবেই তাদের বদলি করা যায় না। কারও অন্যত্র বদলি হলেও আবার ঢাকায় আসেন। কোনো অনুষ্ঠান হলেই এক রঙের পোশাক পরেন তারা। আবার ঢাকার বছিলা হাউজিংয়ে একই সঙ্গে প্লটও কিনেছেন। এই সাত কর্মকর্তার সঙ্গে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ঈসমাইল হোসেন সম্রাট ও জিকে শামীমের সঙ্গে রয়েছে বেশ সখ্য। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিভিন্ন সময়ের ফটোসেশনের ছবিতে। এই সাত উপসহকারী প্রকৌশলী এমপি শাওন, যুবলীগ নেতা সম্রাটের প্রভাব খাটিয়ে পিডব্লিউডি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতিও দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সাত উপসহকারী প্রকৌশলীর কাজই হচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ যুবলীগ নেতা জিকে শামীম ও খালেদকে বাগিয়ে দেওয়া।

এই গ্রূপের প্রধান হলেন জাতীয় সংসদে গণপূর্ত বিভাগের ইএম ডিভিশন-৭-এ কর্মরত আমিনুল ইসলাম। তিনি গণপূর্তে পাওয়ারফুল আমিনুল নামেই বেশি পরিচিত। তার গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহনে। তিনি মূলত এই গ্রুপের প্রধান হয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। ছোট পদে চাকরি করলেও গ্রামে যান হেলিকপ্টারে করে। বেশিরভাগ সময় তিনি ওই এলাকার এমপিরও সফর সঙ্গী হয়েছেন। তবে হেলিকপ্টারের ভাড়া এই আমিনুলই দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে হেলিকপ্টারে চড়া ছবিগুলো আমিনুল বিভিন্ন জনকে দেখিয়ে ফায়দা লোটেন। এমপি শাওনের কথা বলে গণপূর্তে প্রভাবও দেখান। এই আমিনুলের সঙ্গে যুবলীগ নেতা সম্রাটের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও তিনি তাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে দেখা করতেন। তিনি জাতীয় সংসদে কাজ করলেও তার চলাফেরা ও সখ্য যুবলীগের ইসমাইল হোসেন সম্রাট, কাকরাইল-সেগুনবাগিচা এলাকার কমিশনার ফরিদউদ্দিন রতন, জিকে শামীম ও ভোলার সংসদ সদস্য শাওনের সঙ্গে। এই আমিনুলের সেভেন স্টার গ্রুপের কাজই হলো বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ জিকে শামীম ও শাওনের ছোট ফার্মকে ম্যানেজ করে দেওয়া। তার বিনিময়ে পান মোটা অঙ্কের কমিশন।  তার পরিবারও বিএনপি ঘরানার। তিনি ভোলার বিএনপি নেতা শফিক মাস্টারের ভাগনে হিসেবে বেশি পরিচিত।

সেভেন স্টার গ্রুপের ব্যাপারে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সেভেন স্টার গ্রুপ নামে কিছু নেই। এসব ভুয়া কথা মানুষে বলে। আর বিভিন্ন সময়ে তাদের সঙ্গে কাজের সূত্র ধরে পরিচয়। আর মাইনষে মাফিয়া আমিনুল বললে কী করব, বলেন।’ তার দাবি, তিনি মাত্র জীবনে দু’বার হেলিকপ্টারে চড়েছেন। একবার ঈদে হেলিকপ্টারে সিট খালি থাকায় ভোলার এক প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গী হন। অন্যবার এলাকার পার্ক উদ্বোধনেও তার সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। তিনি কখনোই যুবলীগের সম্রাটকে দেখেননি। তবে তার এলাকার এমপি শাওন হওয়ায় তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে যুবলীগের সম্রাটের সঙ্গে শাওনের ভালো সম্পর্ক থাকায় সেই সূত্রে তিনি তাকে চেনেন। আর সম্রাট ও জিকে শামীম তাকে দেখলেও চেনবেনও না বলে দাবি তার। শুধু তাই নয়, তিনি আটক হওয়া যুবলীগ নেতা খালেদ ভূঁইয়াকে কখনো দেখেনওনি বলে জানান।

হুমায়ুন কবির : এই উপসহকারী প্রকৌশলী বর্তমানে ঢাকার মহাখালী গণপূর্তে কর্মরত। তাকে একবার পটুয়াখালীতে বদলিও করা হয়েছিল; কিন্তু তিনি তার গ্রুপের প্রভাব খাটিয়ে আবারও ঢাকায় ফিরে আসেন। কবির তার শ^শুরের নামে জামালপুরে ছয়তলা বাড়ি, ভোলায় নিজের ডুপ্লেক্স বাড়ি, বাড্ডায় রাজউকের হাউজিং প্রকল্পে নিজের ফ্ল্যাট, ভোলায় স্যানেটারি ফিটিংসের দোকান, শ^শুরের নামে একাধিক গার্মেন্টস কারখানা, ভোলায় মাছের ঘের, দুটি গাড়ি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মহাখালী ক্যানসার হাসপাতাল, গেস্ট্রোলিভার হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, যক্ষ্মা হাসপাতালসহ তার জোনে অন্তত ১০টি প্রকল্পের কাজ জিকে শামীমকে পাইয়ে দিয়েছেন তিনি। তার কাজই হলো নতুন প্রকল্পের কাজ জিকে শামীমকে পাইয়ে দেওয়া। এই কর্মকর্তা ঢাকায় প্রায় ১০ বছর ধরে কর্মরত। সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের কাজ পেয়েছিলেন ঠিকাদার জিকে শামীম। কিন্তু নিম্নমানের কাজ করার পর অভিযোগ উঠলেও সেই শামীমকে পুরো বিল দিয়েছেন এই হুমায়ুন। অথচ প্রকল্পটির দেখভালের দায়িত্ব ছিল তার। তিনি বিএনপির নেতা শাহাবুদ্দিন লাল্টুর ভাগনে হিসেবেও পরিচিত। হুমায়ুন কবির দাবি করেন, তার সময়ে জিকে শামীম বিল্ডার্স বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করলেও সম্প্রতি শামীমের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। আর শামীম সবসময় কাজ পাওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে ঘুষ দিতেন। তার বাড়ি, গাড়ি, জমি, মাছের ঘের, ব্যবসা কিছুই নেই। তার বাবা ঠিকাদারি ব্যবসা করেই এসব করেছেন বলে জানান তিনি।

নওশাদুল হক : এই উপসহকারী প্রকৌশলী (ইএম) সার্কেল-৩-এ কর্মরত। তার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট, নিজের গাড়ি এছাড়াও গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের ধর্মপাশায় নামে-বেনামে জমি ও বাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারও পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, একটি পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে অনেক দিন ধরেই এমন বিষোদ্ঘার করে চলেছে। তবে আল্লাহ তাদের বিচার করবে।

মো. আশরাফ : তিনিও উপসহকারী প্রকৌশলী পদে কাজ করছেন। তিনি কর্মরত ইএম ডিভিশন সেভেনে। এই আশরাফ ছাত্রজীবনে চট্টগ্রাম পলিটেকনিকে পড়াশোনা করেছেন। তার ছাত্রজীবন কেটেছে শিবির করে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তার অগাধ সম্পত্তি রয়েছে বলে গণপূর্তের কম-বেশি প্রতিটি কর্মকর্তার কাছে তথ্য রয়েছে।

আতাউর রহমান : তিনি কর্মরত ঢাকার শেওে বাংলানগরের গণপূর্তের বিভাগ-১ (সিভিল)-এ। তিনি পঙ্গু হাসপাতালের কাজের পুরো ফিল্ড তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু তিনি ভালোভাবে কাজ না করায় সেই প্রকল্পের পিডি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল এবং এ কাজের মান অত্যন্ত খারাপ হওয়ার পরও ঠিকাদার জিকে শামীমকে কাজের বিল দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলায়। তার পরিবারও বিএনপি ঘরানার। আতাউর রহমান ঊর্ধ্বতনের অনুমতি নিয়ে এলে তবেই কথা বলবেন বলে জানান।

মিজানুর রহমান প্রধান : তিনি কর্মরত গণপূর্তের ইএম ডিভিশন-৪-এ। মিজানের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। তিনি গজারিয়ায় নামে-বেনামে অসংখ্য জমি কিনেছেন। এছাড়াও যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়ায় একাধিক জায়গা কিনে ফেলে রেখেছেন। তার মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট, মুন্সীগঞ্জে হিমাগার আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মিজান পড়াশোনা করেছেন ঢাকার পলিটেকনিক থেকে। এত কিছু থাকার পরও তিনি বলেন, এসব মিথ্যা।

আসাদুজ্জামান লিপটন : তিনি উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুরের মামাশ^শুর। এই লিপটনের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে। তিনি বর্তমানে মিরপুরে কর্মরত। তিনি চলাফেরা করেন দামি গাড়িতে করে। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকায় কর্মরত এই কর্মকর্তার মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়ায় ও সিদ্ধেশ্বরীর শেলটেকের কুঞ্জ কুঠিরে ফ্ল্যাট রয়েছে। লিপটনের আপন ভাই সোহরাব ঠিকাদারি করেন। তাকে তিনি বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এত কিছু থাকলেও লিপটন সময়ের আলোর কাছে দাবি করেছেন, তিনি ঢাকায় উবারে চলাফেরা করেন। তার নিজস্ব কোনো ফ্ল্যাট ও গাড়ি নেই। আর দীর্ঘদিন ঢাকায় কর্মরত থাকার বিষয়ে আসাদুজ্জামান লিপটন বলেন, বদলি হওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি; কিন্তু বদলি করে না। এ কারণে ঢাকাতেই আছি। আমারও ঢাকায় থাকতে ভালো লাগে না। আর র‌্যাবের হাতে আটক হওয়া যুবলীগ নেতা খালেদ ভূঁইয়াকে তিনি চিনলেও খালেদ যে গণপূর্তের ইলেকট্রিকের কাজগুলো ঠিকাদার হিসেবে করতেন তা তার অজানা।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত