বুধবার, ২৫শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

নুসরাত হত্যায় অধ্যক্ষ সিরাজসহ ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান (রাফি) হত্যা মামলার রায়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৮ মিনিটে এই রায় পড়ে শোনান ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ।

একইসঙ্গে আসামিদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এই টাকা আদায় করে নুসরাতের পরিবারকে দেয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত।

রায় পড়তে সময় লাগে ১২ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড। রায়ে ১৬ জন আসামিকেই দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। রায় পড়ার শুরুতেই নুসরাত জাহান হত্যা মামলায় গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করেন আদালত। আদালত বলেন, গণমাধ্যমের কারণেই এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেশবাসী জানতে পারে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আবদুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা, আবদুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহসভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।

এর আগে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে আসামিদের কাঠগড়ায় আনা হয়। ৩ মিনিটের মধ্যে আসামিদের কাঠগড়ায় তোলা হয়। রায় শোনার পর আসামিরা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেন। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ জানান উচ্চ আদালতে আপিল করবেন তাঁরা। আসামিরা এ সময় বাদীপক্ষের আইনজীবীদের অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করেন। পরে পুলিশ পাহারায় আইনজীবীদের সরিয়ে দেওয়া হয়।

আদালত তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদরাসা ফেনী জেলার অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ। দুই হাজারেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী সেখানে অধ্যায়নরত। এলাকার শিক্ষা সম্প্রসারণে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসার আলোকজ্জল ভুমিকায় কালিমা লিপ্তকারী এ ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় ভিকটিম নুসরাত জাহান রাফির তেজদীপ্ত আত্মত্যাগ তাকে ইতোমধ্যে অমরত্ব দিয়েছে। তার এ অমরত্ব চিরকালের অনুপ্রেরণা।

এই রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, আসামিদের ঔদ্ধত্য কালান্তরে মানবতাকে লজ্জিত করবে নিশ্চয়। তাই দৃষ্টান্তমূলক কঠোরতম শাস্তিই আসামিদের প্রাপ্য। এছাড়া এ ঘটনায় সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম তার পেশাগত তার দায়িত্ব পালনে গাফলতি করেছেন বলেও আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন। এসময় আদালত তাকে তিরস্কার করেন।

রায়ে আরও বলা হয়, এরই প্রেক্ষিতে বিচার্য বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণপূর্বক, আসামিদেরকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে অত্র মামলার ভিকটিম নুসরাত জাহান রাফিকে বিগত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টা ৪৫ থেকে ৯টা ৫০ মিনিট মধ্যে ফেনীস্থ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসার সাইক্লোন সেল্টারের ৩য় তলার ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। এসময় নুসরাতের ওড়না দিয়ে তার হাত-পা বেধেঁ তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে তাকে পুড়িয়ে হত্যা করায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত/০৩) এর ৪ (১)/৩০ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে প্রত্যেক আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো। এছাড়া আসামিদের প্রত্যেককে ১ লক্ষ টাকা করে জরিমানা দণ্ডে দন্ডিত করা হয়।

গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় তাঁর মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করলে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয় বোরকা পরা পাঁচ দুর্বৃত্ত। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ নুসরাতের মৃত্যু হয়।

অগ্নিসন্ত্রাসের এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। গত ২৮ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত শেষে মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে ৮৬৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করে। মাত্র ৬১ কার্যদিবসে মামলার কার্যক্রম শেষ হয়। আর মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে পিবিআইয়ের লাগে ৩৩ কার্যদিবস।

এ মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত ১৬ আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত