বৃহস্পতিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

ঘুষ দূর্নীতির পাশাপাশি ঠিকাদারদের সঙ্গে ব্যবসাও করেন বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলী নেছার

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল (এমএমই) বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি কয়েক জন ঠিকাদারের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসা করারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বিআইডব্লিউটিএ ইউনিটের সিনিয়র সহসভাপতি হওয়ার কারনে তার দাপটে অনিয়ম দূর্নীতি করলেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। তাছাড়া ক্যাসিনো কান্ডে নাম আসা ওয়ার্ড কমিশনার মোমিনুল হক সাঈদের ক্যাডারদের সঙ্গেও রয়েছে নেছারের ঘনিস্ট সম্পর্ক।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার নিজকক্ষে পছন্দের দুই ঠিকাদারকে দিয়ে তারই সহকর্মী, একই বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জরিনা খানমকে বেদম মারধর করিয়েছেন তিনি। ন্যাক্কারজনক এ ঘটনার পরপরই বিআইডব্লিউটিএর সকল বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতামতের ভিত্তিতে সংস্থার চেয়ারম্যান তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। তবে তার সব অপকর্ম ও ঠিকাদারি ব্যবসার বিষয়টি দুদক এর মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। নৌযান ও পন্টুন নির্মাণ, মেরামত এবং কর্মচারিদের বদলি ও সুবিধাজনক স্থানে পদায়নসহ এমএমই বিভাগে তার দুর্নীতির বিষয়টি নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়কেও তদন্তের দাবি সংস্লিষ্টদের।

অভিযোগ রয়েছে, নেছার উদ্দিন বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বিআইডব্লিউটিএ ইউনিটের সিনিয়র সহসভাপতি হওয়ার সুবাদে কাউকে পাত্তাই দেন না। সাংগঠনিক প্রভাব খাটিয়ে সব প্রকল্পের পরিচালক তিনি নিজেই হন। দাপ্তরিক সকল কাজকর্মও চলে তার নির্দেশ মতো।
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, নেছার উদ্দিন বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজে মোট প্রকল্প ব্যয়ের সর্বনি¤œ ১৩% থেকে সর্বোচ্চ ২৫% পর্যন্ত টাকা ঘুষ নিয়ে থাকেন। কোনো কোনো প্রকল্পে বিশেষ করে নৌযান ও পন্টুন মেরামতের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর বিনিময় ঠিকাদারদের তিনি ওইসব কাজে বিদেশী যন্ত্রাংশের পরিবর্তে দেশীয় যন্ত্রাংশ ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে থাকেন। কিছুদিন আগে বিভিন্ন নৌযানের ১৬ জন গ্রিজারকে লাভজনক স্থানে বদলি ও পদায়নের জন্য সংস্থার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠান। এর বিনিময় ওইসব কর্মচারির সঙ্গে জনপ্রতি এক লাখ টাকা চুক্তিবদ্ধ হন।

এদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যান্ত্রিক ও নৌ প্রকৌশল (এমএমই) বিভাগের বরখাস্ত হওয়া অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নেছার উদ্দীন খানের কক্ষ সিলগালা করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল ১৭ অক্টোবর বিকালে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করার কিছুক্ষণ পর তাঁর কক্ষ সিলগালা করে দেয়া হয়। একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। রাজধানী ঢাকার মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ ভবনে সংস্থার প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। এই ভবনের তৃতীয় তলায় এমএমই বিভাগের কার্যালয়। সেখানেই ছিল নেছার উদ্দীন খানের নিজ দপ্তর।

বিআইডব্লিউটিএ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাময়িক বরখাস্ত আদেশ হাতে পাওয়ার কিছুক্ষণ পর নেছার উদ্দীন নিজকক্ষে যান এবং তাঁর ব্যবহৃত কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ও ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরাসহ সেখানকার কিছু মালামাল সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। বিষয়টি জানতে পেরে প্রশাসন শাখা থেকে বাধা দেয়া হয়। এ সময় নেছার উদ্দীনকে প্রশাসন শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, “স্যার, আপনার কক্ষে ঘটনা ঘটেছে। কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটি এখান থেকে আলামত সংগ্রহ করবে। এছাড়ায় থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশও এই কক্ষে আসবে। তাই এখান থেকে কোনো জিনিস সরানো যাবে না।” এরপর সংস্থার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বিআইডব্লিউটিএ সচিবালয়ের প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে কক্ষটি সিলগালা করে দেয়।


প্রসঙ্গত, গতকাল বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) বিকাল আনুমানিক ৪টায় নেছার উদ্দীনের কক্ষে তাঁর উপস্থিতিতে দু’জন ঠিকাদার এমএমই বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জরিনা খানমকে মারপিট করেন। ওই ঠিকাদারদের একটি কাজের বিষয়ে নেছার উদ্দীন ও জরিনা খানমের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ঠিকাদাররা এই নারী প্রকৌশলীর ওপর চড়াও হন বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। তিনি (জরিনা) আরো অভিযোগ করেন, নেছার উদ্দীন ঠিকাদারদের পক্ষ নিয়ে তাঁকে ধমকাচ্ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জরিনা খানম তাকে জানান, তিনি বিস্তারিত না জেনে ফাইল ছাড় করবেন না। এ সময় নেছার উদ্দিনের ইঙ্গিতে দুই ঠিকাদার ওই নারী প্রকৌশলীকে বেদম মারধর করেন। অথচ নেছার উদ্দিন তাদেরকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেননি, এমনকি ঠিকাদারদের আটকের ব্যবস্থা না করে ভবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন বলে নিগৃহিতা জরিনা খানম অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএর উপ-পরিচালক (প্রশাসন) মো. সিরাজুল ইসলাম ভুঁইয়া ঐদিন সন্ধ্যায় মতিঝিল থানায় ওই দুই ঠিকাদারের নামোল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

এদিকে সহকর্মী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জরিনা খানমকে মারধরে প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নেছার উদ্দীন খানকে সাময়িক বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ। বিআইডব্লিউটিএর সচিব কাজী ওয়াকিল নওয়াজ স্বাক্ষরিত দপ্তর আদেশে (দপ্তর আদেশ নং ২০৩৬/২০১৯) বলা হয়েছে, “জনাব মো. নেছার উদ্দীন খান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মেরিন), যান্ত্রিক ও নৌ-প্রকৌশল বিভাগ, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা এর প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় একই বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জরিনা খানমকে ঠিকাদারের মাধ্যমে লাঞ্ছিত করে কর্তৃপক্ষের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করায় কর্তৃপক্ষের চাকুরী প্রবিধানমালা ১৯৯০ এর ৪১(১) প্রবিধান অনুসারে জনাব মো. নেছার উদ্দীন খানকে কর্তৃপক্ষের চাকুরী হতে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো।”

আদেশে আরো বলা হয়, “সাময়িকভাবে বরখাস্তকালীন তিনি বিধি মোতাবেক খোরাকী ভাতা প্রাপ্য হবেন এবং তিনি নিজ দপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকায় দৈনিক হাজিরা প্রদান করবেন। এ আদেশ জারীর তারিখ হতে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে।”

অন্যদিকে, গতকালের অনাকাঙ্খিত ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে সংস্থার পরিচালক (নিরীক্ষা) সিদ্দীকুর রহমানের নেতৃত্বে ওইদিনই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত