সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলে তল্লাশি করা হবে: শেখ হাসিনা

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলগুলোতে উচ্ছৃঙ্খলতা, অনিয়ম বের করতে তল্লাশি (সার্চ) চালানো হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ বুধবার গণভবনে তাঁর যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফর নিয়ে করা সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

বুধবার বিকালে গণভবনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪ তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ এবং ভারত সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধামনন্ত্রী এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, একজন এক রুমে থেকে জমিদারি করতে পারবে না। দশ/বিশ/ত্রিশ টাকা ভাড়া দিয়ে রুম দখল করে মাস্তানি করছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এসব করা চলবে না। এ সময় প্রধানমন্ত্রী একজন শিক্ষার্থীকে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার বানাতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয় বলে জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে বলব, যখন এই ঘটনা একটা জায়গায় ঘটেছে সেখানে এক রুম নিয়ে বসে জমিদারি চাল চালানো, তাহলে প্রত্যেকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটি হল সব জায়গায় সার্চ করা দরকার। কোথায় কি আছে না আছে খুঁজে বের করা এবং এ ধরনের কারা মাস্তানি করে বেড়ায়, কারা এই ধরনের ঘটায় সেটা দেখা।’

তল্লাশি চালানোর ব্যাপারে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘কোথায় অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খলতার মতো কর্মকাণ্ড কারা করছে। কোনো দল-টল আমি বুঝি না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘হিসাব করে দেখুন একটা ছাত্রের পেছনে সরকার কত টাকা খরচ করে? স্বাধীনতা ভালো, কিন্তু সেই স্বাধীনতা বালকের জন্য নয়। যে স্বাধীনতার মর্যাদা দিতে পারবে তার জন্য স্বাধীনতা ভালো। দেখা গেছে একটা রুম নিয়ে মাস্তানি করছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ হচ্ছে তাদের পেছনে। এটি আমি মানব না। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সার্চ করার নির্দেশনা আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেব। আপনারা তাদের বের করে দিন। কোনো দলটল আমি বুঝি না।’

আবরার হত্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবরার হত্যার ঘটনায় আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে ফুটেজ সংগ্রহ করতে। সেখানে আলামত সংগ্রহ করতে। পুলিশ আমাকে ফোন করে জানায় তাদেরকে ফুটেজ নিয়ে আসতে দেয়া হচ্ছে না। তাহলে তাদের মধ্যে কি হামলাকারী কেউ ছিল?

তিনি বলেন, সেই সময় তাদের ঘেরাও করা হলো। পুলিশকে আটকে তিন ঘণ্টা সময় কেন নষ্ট করা হলো? কারা পুলিশকে অবরুদ্ধ করেছে? যারা ওই হত্যায় জড়িত, চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে তারাই কি পুলিশকে অবরুদ্ধ করেছে?

শেখ হাসিনা বলেন, খুব সকাল বেলা যখন খবর পেলাম (আবরারের হত্যা), সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে বলেছি অপরাধীদের গ্রেফতার করতে, আলামত সংরক্ষণ করতে। যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে আলামত সংরক্ষণ একান্ত প্রয়োজন। সেজন্য সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করতে বলেছি। পুলিশও তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো— যখন পুলিশ ওই সিসিটিভি ফুটেজ হার্ডডিস্কে নিয়ে এসেছে, তাদের ঘেরাও করা হলো। তাদের এই ফুটেজ নিয়ে আসতে দেওয়া হবে না।

শেখ হাসিনা বলেন, আইজিপি (পুলিশের মহাপরিচালক) নিজে আসলেন। বললেন, পুলিশ কর্মকর্তাদের আটকে রেখেছে, আসতে দিচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, ব্যাপারটা কী? কেন তারা ফুটেজ নিতে দেবে না? তারা বলছে, পুলিশ নাকি সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট করে দেবে। পুলিশ তো সেখানে গেছে আলামত সংগ্রহ করতে। হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলেট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, পরে একটি কপি (ফুটেজের কপি) কর্তৃপক্ষকে দিয়ে পুলিশ ফুটেজ নিয়ে আসে। সেই ফুটেজ দেখে শনাক্ত করার দরকার ছিল, কারা হত্যাকারী। কে ছাত্রলীগ, কে ছাত্রদল— এগুলো বিবেচনা করিনি। অন্যায়ভাবে একটি ২১ বছরের বাচ্চা ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, আমি শুধু এ ঘটনায় অপরাধীদের ধরতে বলেছি দলমত নির্বিশেষে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি ছাত্রলীগকে ডেকেছি। তাদেরকে বলেছি অভিযুক্তদের বহিষ্কার করতে। আমি জানি স্বজন হারানোর বেদনা কী? আমি আমার স্বজন হারিয়েছি। কত বছর পর বিচার পেয়েছি তা দেশের জনগণের ভুলে যাওয়া উচিত না।

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ছাত্ররাজনীতি করে এ পর্যন্ত এসেছি। আমি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ কেন করব? তবে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে। কেউ করতে চাইলে সেটি করতে পারে।’

বুয়েটে আবরার হত্যা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কিছু হলেই ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথা ওঠে। এই যে বুয়েটে হত্যাকাণ্ড হলো। সেখানে কি কোনো রাজনীতি আছে? যারা অপরাধ করেছে তারা কে কোন দল সেটি আমি বুঝি না।’

ছাত্রলীগের রাজনীতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছাত্রলীগ সব সময় একটা আলাদা স্বাধীন সংগঠন ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া। কারণ তাদের ছাত্র সংগঠন মূল দলে সম্পৃক্ত। তবে হ্যাঁ, মূল দল ছাত্রলীগকে নির্দেশনা দেয়। ছাত্রদের নষ্ট পলিটিক্স জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। আমাদের গঠনতন্ত্র দেখলে দেখবেন ছাত্রলীগ আমাদের অঙ্গ সংগঠন না। এই যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে সংগঠন করা নিষেধ। বুয়েট যদি মনে করে তারা করতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি ব্যান সেটি তো মিলিটারি ডিকটেটরদের কথা। আমি কিন্তু ছাত্র রাজনীতি করে এখানে এসেছি। আমাদের দেশের অসুবিধা হলো মিলিটারি এসে তাদের লোভী করে গেছে। সেটি আসলে নষ্ট রাজনীতি হয়ে গেছে। সেখান থেকে আমরা ফিরিয়ে আনছি ধীরে ধীরে।’

প্রসঙ্গত, ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জেরে রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা।

তবে আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা।

এ ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় ১৪ জন জড়িত বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায়।

এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে তার বাবা চকবাজার থানায় সোমবার রাতে একটি হত্যা মামলা করেন। বুয়েট কর্তৃপক্ষ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। পাশাপাশি গঠন করেছে একটি তদন্ত কমিটিও। এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় বুয়েট শাখার সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ জনকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত