শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

আবরারকে পেটানোর খবর পেয়ে পুলিশ হলে গেলেও ভেতরে ঢুকতে দেয়নি ছাত্রলীগ

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলের ছাত্র আবরার ফাহাদকে পেটানো হচ্ছে, এমন খবর পেয়ে হলে যায় পুলিশ। তবে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পুলিশকে ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে অভ্যর্থনাকক্ষে বসিয়ে রাখেন। এরপর আববারকে উদ্ধারে কোনো ব্যবস্থা না নিয়েই এক ঘণ্টা বসে থেকে ফিরে যায় পুলিশ। দ্বিতীয়বার যখন পুলিশ হলে যায়, তখন আবরার আর বেঁচে নেই। শেরেবাংলা হলের একাধিক শিক্ষার্থী বলেছেন, পুলিশ সময়মতো তৎপর হলে আবরারকে হয়তো বাঁচানো যেত।

পুলিশের লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার কামাল হোসেন শেরেবাংলা হলে পুলিশ গিয়ে ফিরে আসার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, খবর পেয়ে চকবাজার থানার একটি দল শেরেবাংলা হলের ফটকে গেলেও তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে পুলিশ ফিরে আসে। কারা ঢুকতে দেয়নি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, যিনি গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলুন।

ওই রাতে খবর পেয়ে হলের ফটকে গিয়েছিলেন চকবাজার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার হোসেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাত দেড়টার দিকে তিনি খবর পেয়ে সেখানে গেলে তাঁকে অভ্যর্থনাকক্ষে বসিয়ে রাখা হয়। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক (ঘটনার পর ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত) মেহেদি হাসান ওরফে রাসেল তাঁকে বসে থাকতে বলেন। তাঁরা এক ঘণ্টা বসে থাকার পর ফিরে যান। একটি ছেলেকে মারধর করার খবর পেয়ে কেন বসে থাকলেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনুমতি ছাড়া হলের ভেতরে গেলে অন্য কিছু হতে পারে ভেবে ভেতরে যাননি।

জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক নাঈম আহমেদ বলেন, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের প্রধান কাজ হলো ঘটনার শিকার ব্যক্তিকে উদ্ধার করা। কেউ যখন মৃত্যুঝুঁকিতে থাকেন, শারীরিক ক্ষতির শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন, তখন তাঁকে উদ্ধার করাই প্রধান কাজ।

আবরার হত্যা মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র জানায়, আবরারকে ডেকে আনা, মারধর করা এবং পুলিশকে খবর দেওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুই তদারক করছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেল। লাশ গুম ও আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন ছাত্রলীগ নেতারা। এ কাজে রাসেলকে সহায়তা করেন শাখা ছাত্রলীগের অন্য নেতা-কর্মীরা। পুলিশ মনে করছে, ২৪-২৫ জন এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ জনকে চিহ্নিত করে মামলার আসামি করা হয়েছে।

আবরার হত্যা মামলায় গতকাল এজাহারভুক্ত আরও তিন আসামিকে ঢাকা ও গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ডিবি রাজধানীর জিগাতলা এলাকা থেকে শামসুল আরেফিন ওরফে রাফাত (২১), ডেমরা থেকে মনিরুজ্জামান এবং গাজীপুর থেকে আকাশ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। শামসুল আরেফিন বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৭তম ব্যাচের, আকাশ ও মনিরুজ্জামান ১৬তম ব্যাচের ছাত্র। এ নিয়ে এ ঘটনায় ১৩ ছাত্র গ্রেপ্তার হলেন।

আলোচিত এ মামলা তদন্তের ভার পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার ১০ শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল মঙ্গলবার পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। যাঁদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে তাঁরা হলেন মেহেদি হাসান ওরফে রাসেল, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহতাসিম ফুয়াদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম, উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারেফ, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন, গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে মুন্না, ছাত্রলীগের কর্মী মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ও মুজাহিদুর রহমান।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই ছাত্রলীগ নেতারা কিছুদিন ধরেই আবরারকে অনুসরণ করছিলেন। আবরারের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে তাঁকে শিবির-সমর্থক বলে সন্দেহ করছিলেন। সর্বশেষ তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে হওয়া কয়েকটি চুক্তি নিয়ে মন্তব্য দেখে কয়েকজন ক্ষুব্ধ হন। এর আগে হলের খাবারের মান নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন আবরার। এ নিয়ে ছাত্রলীগ নেতা রাসেলের সঙ্গে আবরারের সামান্য কথা-কাটাকাটি হয়। আবরারের এমন প্রতিবাদ রাসেলরা মেনে নিতে পারেননি।

মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে জড়িত সন্দেহে তিন-চার দিন আগেই আবরারকে মারধরের পরিকল্পনা করেছিলেন রাসেল ও মুহতাসিম ফুয়াদ। কিন্তু আবরার গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ায় পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। গত রোববার বিকেলে আবরার হলে ফিরে এলে রাতেই তাঁকে মারধর করার সিদ্ধান্ত নেন ছাত্রলীগ নেতারা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আবরারের সঙ্গে একই বর্ষে পড়ুয়া ছাত্রলীগ নেতা মুনতাসির আল জেমির নেতৃত্বে চারজন রোববার রাত আটটার পরপর আবরারের কক্ষ (১০১১ নম্বর) থেকে দোতলার ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান। এই কক্ষে ছাত্রলীগ নেতারা থাকেন। সেখানে ইফতি মোশারেফ ওরফে সকাল, মেহেদী হাসান ওরফে রবিন ও মেফতাহুল প্রথমে আবরারের মুঠোফোন নিয়ে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ঘেঁটে দেখেন। এরপর তিনটি ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে আবরারকে পেটাতে শুরু করেন। আবরারের চিৎকার-কান্নাকাটি শুনে কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থী এগিয়ে এলে তাঁরা বলেন, ‘শিবির ধরা হয়েছে’। এরপর সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে চলে যান। কিছুক্ষণ পর রাফাত, মনিরুজ্জামান, আকাশসহ ছাত্রলীগের আরও কয়েকজন নেতা-কর্মী ওই কক্ষে যান। তাঁরাও ক্রিকেটের স্টাম্প দিয়ে আবরারকে আরেক দফায় বেদম পেটাতে শুরু করেন। এভাবে মারধর করতে গিয়ে দুটি স্টাম্প ভেঙে যায়। মারধরের একপর্যায়ে রাত একটার দিকে নিস্তেজ হয়ে পড়েন আবরার।

ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা এ পর্যায়ে নিজেদের মধ্যে সলাপরামর্শ করেন। একজন বলেন, মারধর না করে শিবির বলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হোক। রাত দেড়টার পর ছাত্রলীগ নেতা রাসেল লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার কামাল হোসেনকে ফোন করে ঘটনা জানান। তবে কামাল হোসেন বলেন, রাসেল তাঁকে ফোন করেননি, তিনি সরাসরি থানায় ফোন করেছিলেন। থানা থেকে তিনি ঘটনা জানতে পারেন। রাসেলের ফোন পেয়ে টহলে থাকা উপপরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন হলের সামনে যান। এ সময় ছাত্রলীগ নেতারা আবরারকে পুলিশে দেবেন, নাকি অন্য কিছু করবেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েন। তাঁরা পুলিশকে জানান, তাঁরা এক ‘শিবিরকর্মী’ ধরেছেন, তাঁকে পুলিশে না দিয়ে কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেবেন। এ সময় পুলিশকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন রাসেল। পুলিশ সেখানে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে ফিরে যায়।

তবে ওই হলের একজন ছাত্র বলেন, পুলিশ এসে ঘটনার বিবরণ শুনে ভেতরে না ঢুকে চলে যায়। পুলিশ চাইলে ভেতরে গিয়ে আবরারকে হাসপাতালে নিতে পারত। তাহলে হয়তো আবরার বেঁচে যেতেন।

অন্য একজন ছাত্র জানান, পুলিশ চলে যাওয়ার পর ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশে ছাত্রলীগের চার কর্মী আবরারকে চ্যাংদোলা করে ২০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে একটি বিছানায় শোয়ানোর পরই নিথর হয়ে যান আবরার। এরপর ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার গুরুত্বপূর্ণ নেতা-কর্মীদের সেখানে ডাকা হয়। তাঁরা ২০০৫ নম্বর কক্ষে গিয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলেন না। কেউ আবরারকে হলের বাইরে রাস্তায় ফেলে দিতে বলেন। কেউ বলেন সিঁড়ির গোড়ায় বা ছাদে রেখে আসতে। তখন আবরারকে সরিয়ে ফেলার জন্য কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁরা একটি চাদরে মুড়িয়ে আবরারের নিথর দেহটি দোতলা ও নিচতলার মাঝামাঝি সিঁড়িতে নিয়ে রাখেন।

হলের একজন কর্মী প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খানকে ফোন করে ঘটনাটি জানালে তিনি গেটের সামনে আসেন। প্রভোস্ট বলেন, ‘রাত পৌনে তিনটার দিকে খবর পাই একজন শিক্ষার্থী পড়ে আছে। তাৎক্ষণিকভাবে বুয়েটের চিকিৎসক মাসুক এলাহীকে জানাই। তিনি এসে জানান ছেলেটি বেঁচে নেই। পরে পুলিশকে খবর দিই।’

চকবাজার থানার এসআই দেলোয়ার হোসেন লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে লেখেন, সোমবার ভোর ৪টা ৭ মিনিটে পুলিশের বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি হলে এসে মৃত আবরারকে পান। ভোরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠান। কিন্তু মামলার বিবরণে বলা হয়, আববারকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।

সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, যদি সত্যি পুলিশ আগেই জেনে থাকে এবং পুলিশকে যদি ঘটনাস্থলে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো উচিত ছিল। আরও ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলে হয়তো এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটত না।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত