শুক্রবার, ১লা অক্টোবর, ২০২০ ইং

দলে ‘হাইব্রিডের’ দৌরাত্ম্য বন্ধ চান তাঁরাও

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

‘শুরু তো হলো, চলবে কদিন? ’
‘আরও আগেই তো শুরু হওয়ার দরকার ছিল। আসল অপরাধীরা ধরা পড়বে তো?’
‘অভিযান কি শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, না মাঠেও চলবে?’

সাম্প্রতিক সময়ে চলা দলের ‘দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান’ নিয়ে মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন নানা প্রশ্ন। মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত এই অভিযান নিয়ে মাঠের পোড় খাওয়া নেতা-কর্মীদের মধ্যেই সংশয় প্রবল। তবে এত সংশয়ের ভিড়ে মাঠের নেতারা বরং অভিযান নিয়ে খুশি।

আওয়ামী লীগে কীভাবে এত দুর্বৃত্ত ঢুকে পড়ল, তা নিয়ে প্রশ্ন অনেকের। এ জন্য কেন্দ্রীয় অনেক নেতাকে দুষতেও দেখা গেছে অনেককে। দলের ভেতরে অপশক্তির তৎপরতা নিয়ে ‘বড় ফোরামে’ কথা বলতে পারেননি বা বলতে দেওয়া হয়নি—এমন অনুযোগও এসেছে কারও কারও কাছ থেকে।

দেশের মোট ১০ জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের ১৮ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। এঁদের বেশির ভাগ বয়সে প্রবীণ। ত্যাগী নেতা হিসেবে সুনাম আছে তাঁদের। কথা হয়েছে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গেও। সবাই চান অভিযান কেন্দ্র থেকে মাঠে গড়াক। কারণ সেখানেও এখন ‘হাইব্রিড’ নেতাদের দৌরাত্ম্য।

মাঠের এই বার্তায় খুশি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও। যদিও তাঁরা এটা মানতে নারাজ যে দলের মাঠের কর্মীদের কথা শোনা হয়নি।

আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ দিয়েই এই ‘শুদ্ধি অভিযানের’ শুরু। কয়েক দিন ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজ থেকে কমিশন দাবি, টাকা নিয়ে কমিটিতে পদ দেওয়া, ক্ষমতার অবৈধ প্রদর্শনসহ ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদ থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা আসে। ওই দিন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ওই সিদ্ধান্ত হয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে যুবলীগের একাধিক নেতার কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান প্রধানমন্ত্রী।

১৮ সেপ্টেম্বর বুধবার থেকে শুরু হয় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ওই দিন মতিঝিলের ইয়ংমেনস ফকিরাপুল, ওয়ান্ডারার্স, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্র ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে যুবলীগ, কৃষক লীগ ও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী ১৯ সেপ্টেম্বর বলেন, ‘আমি কোনো নালিশ শুনতে চাই না। ছাত্রলীগের পর যুবলীগকে ধরেছি। একে একে সব ধরব।’

এরপর ঢাকার একাধিক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হানা দিয়ে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চট্টগ্রামেও একাধিক অভিযান চলে।

এসব অভিযান নিয়ে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মকবুল হোসেন বলছিলেন, ‘দলে অনেক আগাছা ঢুকে গেছে। এসব ছেঁটে ফেলা খুব দরকার ছিল। এ অভিযানকে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই।’

বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত বগুড়ার জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে তাঁকে প্রথম নিয়োগ দেয় আওয়ামী লীগ। সেই সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ বিরোধিতা করে। পরে জেলা পরিষদের নির্বাচন হলে দলীয় মনোনয়ন তাঁকেই দেওয়া হয়। দেশের সব জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ হলেও বাদ ছিল বগুড়া। স্থানীয় প্রবল প্রতিপত্তিশালী গোষ্ঠী এ নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখে। কিন্তু কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ মকবুল হোসেনের বিষয়ে অনড় ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনিই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন। মকবুল হোসেন বলছিলেন, ‘মাঠপর্যায়ে দুষ্টচক্রের এখন প্রবল প্রভাব। এর সমাধান দরকার। এর জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আছি।’

কেন্দ্রের এই অভিযানে খুশি চট্টগ্রামের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম । দীর্ঘদিন ধরে এ পদে আছেন। প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ মনে করেন, এখন শুধু রাজধানীতে যে দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতা চলছে, এর বিস্তৃতি দরকার মাঠেও।

পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হাকিমের উদ্বেগ এই নিয়ে যে, অভিযানে যেন ‘পদ্ধতিগত ত্রুটি’ না হয়। কী বোঝাচ্ছেন পদ্ধতিগত ত্রুটি বলতে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ষাটের দশকের শেষে তৎকালীন ইকবাল হলের ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হাকিম বলেন, ‘রাঘববোয়াল ছেড়ে শুধু চুনোপুঁটিরা যেন ধরা না পড়ে।’

বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহস্পর্শ এখনো অনুভব করেন সত্তরোর্ধ্ব হাকিম। বঙ্গবন্ধু-তনয় শেখ কামালের সঙ্গে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি থাকা হাকিম বলেন, ‘শুদ্ধি অভিযান চরম দরকার হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে দলের ভেতর ঘাপটি মেরে ছিল স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। এরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। টাকা আর টাকা—এটাই ছিল তাদের একমাত্র চাওয়া। আর এ টাকা আয় করতে দল ছিল মেশিন।’

রাঘববোয়ালদের ধরার ব্যাপারে সন্দিহান এম এ হাকিমকে অবশ্য আশ্বস্ত করতে পারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য। গত বুধবার সাভারে এক অনুষ্ঠানে চলমান এ অভিযান নিয়ে কাদের বলেছেন, ‘দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি যারাই করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চুনোপুঁটি-রাঘববোয়াল কেউই ছাড় পাবে না। লোক দেখাতে নয়, দুর্নীতি-মাদক-জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে সরকার।’

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জেলে পোরা হয় দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিজানুর রহমানকে। এরপর জাতীয় পার্টি ও বিএনপির আমলেও জেল খেটেছেন। মিজানুর রহমানের বক্তব্য, ‘দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা এখন অপাঙক্তেয় হয়ে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। আদর্শবাদী মানুষেরা এই অভিযানকে স্বাগত জানাবেই। এই অভিযান ত্যাগী কর্মীদের উৎসাহিত করবে।’

১৯৭৩ এ ছাত্রলীগের ‘খুদে কর্মী’ ছিলেন মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার উদ্দিন। ১৯৭৭-এ তৎকালীন থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, পরে সভাপতি। ১৯৭৯-তে আওয়ামী লীগে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্থানীয় সরকার বা জাতীয় সংসদ কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হননি। এর কারণ হিসেবে আনোয়ার উদ্দিনের যুক্তি, ‘এখন ভোটে যেতে অনেক অর্থ লাগে। তেমন অর্থ আমার নেই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শটা নিয়েই থাকতে চাই।’

দিন দিন প্রাচীন এই দলে বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য অসহনীয় হয়ে উঠছিল বলে মন্তব্য করেন আনোয়ার। তাঁর কথা, ‘দলের সব অর্জন গুটিকয় দুষ্কৃতকারীর জন্য নষ্ট হবে, এটা মানা যায় না। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে, তাকে সাধুবাদ জানাই।’

এনামুল হক যশোরের অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতকোত্তর সেই সত্তরের দশকে। একসময় বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। ১৯৭৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন। একসময় অভয়নগর পৌরসভার মেয়র ছিলেন। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিক অকপটে বলছিলেন, ‘বাইরের সব মানুষ এসে রাজনীতিটা খেয়ে ফেলছিল। নিজের এলাকায় দেখছিলাম, রাজনীতিহীন মানুষেরা অর্থ দিয়ে সবকিছু দখল করছে। এর অবসান হওয়া জরুরি।’

নিজের অভিজ্ঞতার নিরিখে এনামুল হকের বক্তব্য, দলে ঢোকা সুবিধাবাদীরা ক্ষতি করছে নানাভাবে। এরা প্রথমত কর্মীদের অর্থ দিয়ে কিনে ফেলছে দিন দিন। এসব কর্মী জড়ো হচ্ছে দুষ্টু নেতাদের পেছনে। আর এর ফলে কর্মীরা ভুল নেতা নির্বাচন করছে। এক ‘দুষ্টচক্র’ তৈরি হচ্ছে। এর অবসান দরকার। তবে এর অবসান হবে কি না, তা নিয়ে এখনো সন্দিহান।

মাঠপর্যায়ের এসব কথা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে কখনো বলেছেন? এমন প্রশ্নে এনামুল হকের অকপট উত্তর, ‘আসলে এমন ফোরাম পাইনি।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য দাবি করেন, আওয়ামী লীগে কথা বলার স্বাধীনতা অবশ্যই আছে।

আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ বলেন, ‘এটা রাজনৈতিক অভিযান নয়, অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পেশাদারির পরিচয় দিচ্ছে। দেশবাসী এটাকে সাধুবাদ জানিয়েছে । সরকারের নির্বাহী প্রধান এটাকে সমর্থন দিচ্ছেন।’

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা গাজী মোহাম্মদ আলী মনে করেন, দলে এখন যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে, তা অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী রাজনীতিতে থাকা গাজী মোহাম্মদ আলীর কথা, ‘দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায়। এ অবস্থায় অনেক আবর্জনা জুটেছে। আরও পাঁচ বছর আগে থেকে নেওয়া যেত এসব পদক্ষেপ।’

মাঠের কথা, দেরিতে শুরু হয়েছে অভিযান। এ প্রসঙ্গে খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্য, ‘এখানে ভালো কিছু হলে সব সময় বলা হয়, আরও আগে বা বেশি করা উচিত ছিল, কেন আগে করা হয়নি? এসব প্রশ্ন আসে। যেসব কর্মকাণ্ড চলেছে, তা তো কাউকে করতে বলা হয়নি। এখন একটি পরিস্থিতির জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব করছে। এটা তাদের করতেই হতো। হয়তো তারা একটু প্রস্তুতি নিয়েছিল।’

টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক তানভীর হাসান ছোট মনিরের ছাত্রলীগ দিয়ে রাজনীতির শুরু। এরপর জার্মানিতে চলে যান। সেখানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এরপর জেলা আওয়ামী লীগে এসে যোগ দেন। এখন টাঙ্গাইল-২ আসনের সাংসদও। মনির বলছিলেন, ‘এ অভিযান মাঠে শুভ বার্তা দিচ্ছে। যাদের মেধা আছে, যোগ্যতা আছে, এখন তারাই আসবে নেতৃত্বে। এর ব্যত্যয় ছিল না, তা বলা যাবে না। তবে এখন নিশ্চয়ই পরিস্থিতি পাল্টাবে।’

ছোট মনির জানান, তাঁর মাঠপর্যায়ে ছাত্রলীগের কমিটিও করা হচ্ছে পরীক্ষার মাধ্যমে। দেশের ইতিহাস ও রাজনীতিসংবলিত প্রশ্নপত্র তৈরি করে এসব পরীক্ষা চলছে। এর উদ্দেশ্য, মেধাবী নেতৃত্ব তৈরি।

শাসক দলের এ অভিযানকে লোকদেখানো বলে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ একাধিক নেতা। এর মাধ্যমে শাসক দলের ‘সীমাহীন দুর্নীতির’ চিত্র ফুটে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেছেন একাধিক নেতা।

চলমান শুদ্ধি অভিযানে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ধরা পড়ছেন। তাঁদের দুর্নীতির চিত্র উঠে আসছে। এতে এক ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি আছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি কী আখেরে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার অবশ্য মনে করেন, আওয়ামী লীগ তার এক সুসময়ে আছে। সেই অর্থে তার কোনো বিরোধী নেই। শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘আমার ধারণা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, ঠিক এ সময়ই এ ধরনের শুদ্ধি অভিযান তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। দল যদি সংকটে থাকে তখন এ ধরনের অভিযানে কেউ যায় না। তখন অনেক বেশি ঝুঁকি থাকে। তবে তা এখন নেই বলেই মনে হয়।’

Print Friendly, PDF & Email

মতামত