বুধবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

অবরুদ্ধ কাশ্মীরে ক্ষোভ, চোখের জল

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

গত সোমবার ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর দুই টুকরো করার ঘোষণার পর থেকেই তা অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে। আগে থেকেই সেনা–ঠাসা অঞ্চলটিতে সেনাসংখ্যা আরও বিপুল হারে বাড়ানো হয়েছে। জনশূন্য রাস্তাঘাটগুলোয় এখন অস্ত্রসজ্জিত উর্দি পরা ব্যক্তিদের নজরদারি। দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, গণপরিবহন সব বন্ধ। কাশ্মীরের পুরো অঞ্চলজুড়েই এখন ভয়, আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তার এক মিশ্র ছাপ। অবরুদ্ধের ছয় দিন হয়ে গেছে। বিশেষ মর্যাদা হারানোর কান্নায় ভারী হয়ে আছে কাশ্মীরের আকাশ-বাতাস। নিজেদের প্রতারিত ভাবছেন কাশ্মীরিরা। আর এই বোধ শাসকদের প্রতি ক্ষোভ বারুদের মতো জ্বালিয়ে দিয়েছে।

বিবিসির সাংবাদিক গীতা পাণ্ডে খবরের সন্ধানে ওই অঞ্চলে ঘুরছেন দুদিন ধরে। তাঁর প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে অবরুদ্ধ কাশ্মীরিদের আবেগ, রাগ, ক্ষোভের কথা। বিবিসির সাংবাদিক যেখানে রয়েছেন, সেটা শ্রীনগরের একেবারে মূল কেন্দ্র খানইয়ার এলাকা। ভারতবিরোধী বিক্ষোভের জন্য এলাকাটির বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।

সোমবার ভারতের বিজেপি সরকার দেশটির সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করে। এতে জম্মু ও কাশ্মীর আলাদা রাজ্য না থেকে দ্বিখণ্ডিত হলো। জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ এখন থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হবে। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে গত বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, তাঁর সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে কাশ্মীরে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এ অনুচ্ছেদ স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি। জম্মু ও কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করার বিলটি এর মধ্যে দেশটির সংসদে পাস হয়েছে। গত শুক্রবার বিলটিতে সই করেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতা সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের ১৪৪তম জন্মবার্ষিকীর দিন ৩১ অক্টোবর থেকে দ্বিখণ্ডিত জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে কার্যকর হবে।

‘আমিও অস্ত্র তুলে নেব’
বিবিসির সাংবাদিক শ্রীনগরে সড়কের ব্যারিকেড পেরিয়ে যখন ছবি তোলার জন্য নামলেন, তখন একটি গলি থেকে বেরিয়ে এলেন কয়েকজন। সাংবাদিক বুঝেই তাঁরা ঝাড়লেন ক্ষোভ। ছোট্ট দলটার বয়স্ক একজন বললেন, সরকার তাঁদের চরমভাবে ঠকাল।

আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের সরিয়ে দিতে গেলে বয়স্ক লোকটি ক্ষোভে হাত উঁচিয়ে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘তোমরা দিনে আমাদের আটকে রাখো। তোমার রাতে আমাদের আটকে রাখো।’ বাহিনীর সদস্যরা বললেন, কারফিউ জারি আছে। তাঁরা যেন অবশ্যই বাড়ির ভেতর চলে যান। কিন্তু বয়স্ক লোকটি সরছিলেন না। সেখানেই দাঁড়িয়ে তিনি যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছিলেন।

সাংবাদিক গীতা পাণ্ডেকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। তিনি সরে যেতে উদ্যত হলে ছোট্ট একটি ছেলেকে কোলে নিয়ে এক যুবক তাঁর কাছে এসে বললেন, তিনি ভারতের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে প্রস্তুত। কোলের ছেলেকে দেখিয়ে বললেন, ‘ও আমার একমাত্র ছেলে। ও অনেক ছোট। কিন্তু আমি ওকেও অস্ত্র তুলে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করব।’ ওই যুবক এত ক্ষুব্ধ ছিলেন যে চারপাশে কে আছে, তা নিয়ে মোটেও ভাবছিলেন না। তাঁর কথাগুলো কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছিল।

‘কাশ্মীর এখন বিশাল উন্মুক্ত কারাগার’
মুসলিম–অধ্যুষিত কাশ্মীর ভ্যালির একজন বললেন, নিরাপত্তা বাহিনীর এমন ভয়ের মধ্যে তিনি আর জীবন কাটাতে চান না। ৩০ বছর ধরে এখানে স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহীরা লড়াই করছে। তবে বাসিন্দাদের অনেকেই ভারত থেকে পৃথক হওয়ার আগ্রহ দেখাননি। তবে দিল্লির শাসকদের ‘স্বৈরাচারী নির্দেশের’ পর থেকে বাসিন্দারা নতুন করে ভাবছেন। নতুন ঘোষণা ভারত ও কাশ্মীরের জন্য খারাপ পরিণতি ডেকে আনবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

কাশ্মীরের পুরো অঞ্চলজুড়েই এখন ভয়, আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তার এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া। জম্মু ও কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর গত সোমবার থেকে ভুতুড়ে নগরে পরিণত হয়েছে। দোকানপাট, স্কুল, কলেজ, অফিস সব বন্ধ। রাস্তাঘাটে কোনো গণপরিবহন চলছে না।

সড়কজুড়ে টহল দিয়ে বেড়ায় সশস্ত্র হাজার হাজার সেনা। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। বাসিন্দারা বাড়িতে অবরুদ্ধ। প্রায় এক সপ্তাহের অবরুদ্ধ সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। রাজ্যের এক মন্ত্রীকে গৃহবন্দী রাখা হয়েছে। শত শত কর্মী, ব্যবসায়ী ও অধ্যাপককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের অস্থায়ী কারাগারে রাখা হয়েছে।

রেজওয়ান মালিক নামের একজন কাশ্মীরি বললেন, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে ঘোষণা দেওয়ার দুদিনের মধ্যে তিনি দিল্লি থেকে শ্রীনগরে আসেন। শ্রীনগরে তাঁর পরিবার রয়েছে। ওই দুদিন তিনি পরিবারের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘কাশ্মীরকে এখন মনে হচ্ছে একটি কারাগার, বিশাল উন্মুক্ত কারাগার।’

রেজওয়ান মালিক বলেন, গত রোববার রাতে তিনি মা–বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। পরদিন সরকার কাশ্মীরের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল। কাশ্মীরের কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। বন্ধু, স্বজন কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করতে পেরে তিনি বাড়ি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে এই প্রথম অন্য একজনের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে না পারার মতো ঘটনা ঘটল। এমনটা আমি এর আগে কখনো দেখিনি।’

কাশ্মীরিদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়া স্বতন্ত্র শাসনের বিশেষ মর্যাদা রদ হওয়ার ঘটনাটি নিয়ে তিনি আতঙ্ক বোধ করছেন বলে জানালেন।

২৫ বছরের তরুণ রেজওয়ান ওই দলে পড়েন না, যারা স্বাধীন কাশ্মীর চায়। তিনি কখনো এ দাবি জানিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেননি বা ভারতীয় সৈন্যদের দিকে পাথর ছুড়ে মারেননি। তিনি দিল্লিতে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। তিনি বলেন, ‘যদি ভারত আমাদের বিশ্বাস করাতে চায় যে এটাই গণতন্ত্র, তাহলে তারা নিজেদেরই বোকা বানাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের বহু বছর ধরে অস্থির সম্পর্ক রয়েছে। সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা ভারত ও কাশ্মীরের মধ্যে সেই সম্পর্কের মধ্যেও সেতু হিসেবে কাজ করত। এটা বাতিল করে তারা আমাদের আত্মপরিচয় ছিনিয়ে নিয়েছে। এটা যেকোনো কাশ্মীরিদের কাছে অগ্রহণযোগ্য।’

রেজওয়ানের মতে, কারফিউ তুলে নিলে এবং বিক্ষোভকারীরা যদি রাস্তায় নামতে সক্ষম হয়, তাহলে তাতে প্রত্যেক কাশ্মীরি যোগ দেবেন। তিনি বলেন, ‘বলা হতো, কাশ্মীরি পরিবারগুলোতে এক ভাই পৃথক কাশ্মীর চাইলে আরেক ভাই ভারতের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দেয়। তবে ভারতীয় সরকার (নতুন ঘোষণা দিয়ে) এই ভিন্নমত পোষণ করা ভাইদের এক করে দিয়েছে।’

রেজওয়ানের বোন রুখসার রশিদ (২০) কাশ্মীর ইউনিভার্সিটিতে স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের ছাত্রী। তিনি বলেন, টেলিভিশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা শুনে তাঁর হাত কাঁপা শুরু করে। তাঁর মা ধপ করে তাঁর পাশে বসে পড়েন, কান্না শুরু করেন। মা বলছিলেন, এর চেয়ে মৃত্যুও ভালো ছিল। প্রতিদিন প্রচণ্ড ভীতি নিয়ে তাঁর ঘুম ভাঙে। তাঁর নানা-নানি শহরের বাতমালু এলাকায় থাকেন। তাঁরা বলেছেন, এলাকাটি আফগানিস্তানে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বকে উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে ভারত
শহরটিতে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত তথ্য পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে। মানুষের মুখে মুখে কথা ছড়াচ্ছে অনেক বেশি। প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হচ্ছে। শ্রীনগরসহ অন্য স্থানগুলোয় সেনাদের লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুড়ছে। শোনা গেছে, সেনাদের ধাওয়া খেয়ে এক বিক্ষোভকারী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছেন। অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তবে ভারতের সরকার কাশ্মীর পরিস্থিতি একদম স্বাভাবিক রয়েছে বলে দেখানোর চেষ্টা করছে। গত বুধবার টিভিতে দেখানো হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল কাশ্মীর ভ্যালির দক্ষিণে শোপিয়ান শহরে রাস্তায় বসে কিছু মানুষের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। এলাকাটিকে ভারত ‘জঙ্গিদের আখড়া’ বলে থাকে। ভারত বিশ্বকে দেখানোর চেষ্টা করল, কট্টর এই এলাকার মানুষও সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে রয়েছে এবং পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে।

এটাকে লোকদেখানো বলছেন কাশ্মীরিরা। তাঁদের মতে, লোকজন যদি খুশিই হতো, তাহলে কেন কারফিউ? কেন এভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা?

এ বছরের পুলাওয়ামায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় ভারতের আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নিহত হন। জঙ্গি আস্তানা লক্ষ্য করে এরপর পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালায় ভারত। ওই ঘটনা দুই দেশকে যুদ্ধাবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল। বিবিসি সাংবাদিক পুলাওয়ামায় গিয়ে দেখেন, সেখানেও ভারতের সরকারের নতুন ঘোষণার বিরুদ্ধে ক্ষোভ রয়েছে মানুষের মধ্যে। সাংবাদিকের গাড়ি দেখে তাঁরা ঘিরে ধরেন ক্ষোভ প্রকাশের জন্য। বিশ্বকে তাঁরা শোষণের শিকার হওয়ার কথা শোনাতে চান।

পুলাওয়ামার একজন আইনজীবী জাহিদ হুসেন দার বলেন, কাশ্মীর এখন অবরুদ্ধ হয়ে আছে। অবরোধ উঠলেই সংকট শুরু হবে। রাজনীতিক ও পৃথক কাশ্মীরের দাবিতে আন্দোলনকারী নেতারা বন্দিদশা থেকে মুক্ত হলে তাঁরা বিক্ষোভের ডাক দেবেন। আর তখন সব লোক রাস্তায় নেমে আসবে।

অবরুদ্ধ কাশ্মীরে বড় ধরনের বিক্ষোভ না হওয়ার ঘটনাকে ভারতীয় অনেক গণমাধ্যম বলছে, কাশ্মীরিরা সরকারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু যাঁরা কাশ্মীরকে চেনেন, যাঁরা শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের লড়াই দেখেছেন, তাঁরা বুঝতে পারছেন, এ কাশ্মীর এখন অন্য রকম। কাশ্মীরিদের মধ্যে এখন যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে, তা নজিরবিহীন।

এক শিক্ষার্থী পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন ‘ঝড় ওঠার আগে শান্ত’ পরিস্থিতি হিসেবে। তাঁর ভাষ্য, ‘সমুদ্র এখন শান্ত মনে হচ্ছে, কিন্তু সুনামি তীরে আঘাত হানতে যাচ্ছে বলে।’

Print Friendly, PDF & Email

মতামত