শুক্রবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

নিউজগার্ডেনবিডডটকম:

মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে সকাল ৯টায় শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা।

রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে মুখোশের মুখে রাজা আর রানি, মাঝে তাদের প্রজাকুল। বৃক্ষচূড়ায় মা পাখি আর ছানা, ডানা মেলেছে কমলা বরণ প্যাঁচা। তাদের পিছু পিছু এল হরিণ, জীবনবৃক্ষ, ষাঁড়, কাঠ ঠোকরা, টেপা পুতুল, বাঘ আর বক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবদ্য’ রচনার বাণী থেকে ওই পংক্তিকে প্রতিপাদ্য করেই রোববার ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ।

রোববার সকালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন শেষ হতে হতে চারুকলা অনুষদে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতিও সারা হয়ে যায়।

শোভাযাত্রাকে ঘিরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা বলয়। পুলিশের নিরাপত্তা বেস্টনির মধ্যেই এগিয়ে যায় শোভাযাত্রা। মাঝপথে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

নিরাপত্তার স্বার্থে আগে থেকেই বলা হয়েছিল, যারা শোভাযাত্রায় অংশ নিতে চাইবে তাদের সবাইকে চারুকলা চত্বর থেকে অংশ নিতে হবে।মঙ্গল শোভাযাত্রাটি শাহবাগ মোড়, ঢাকা ক্লাব ঘুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। পরে রাজু ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ছিল ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ গ্রন্থের ‘ত্রাণ’ কবিতা থেকে নেওয়া এই পঙক্তি প্রসঙ্গে চারুকলার অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগের শিক্ষক নিসার হুসেন  বলেন, ‘এই কবিতাটি মঙ্গলময় প্রার্থনার মতো শোনায় সবার কাছে। এখানে দুর্ভাগ্য, লোকভয়, রাজভয়, মৃত্যুভয় দূর করে মঙ্গল বার্তা নিয়ে আসার কথা বলেছেন কবিগুরু। এ জন্যই পঙক্তিটি মঙ্গল বার্তার শোভাযাত্রায় ব্যবহার করা হয়েছে।’

শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের গর্বের পরম্পরা এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। এটি গোটা বাঙালি জাতির জন্যও সম্মানের। শুরু থেকেই আমি শোভাযাত্রায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করি। আজও খুব সকালে এসে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। দেশের মানুষের জন্য সুখ ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসুক এবারের নববর্ষ— এটাই প্রার্থনা।’

১৯৮৯ সাল থেকে নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বের হয়েছিল এই শোভাযাত্রা। যেখানে দেশের লোকশিল্পের নানা অনুষঙ্গের সঙ্গে শুরু থেকেই স্থান পেতে থাকে নকশা আঁকা পাখা, ফুল, প্রজাপতি, প্রকৃতি ও বাহারি রঙের পাখির মুখোশ। ফলে ২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এ বছর বর্ণাঢ্য এই আয়োজন পা রাখল ৩০ বছরে।

বরাবরের মতোই চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরাই আয়োজন করে থাকে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ বছরের এই আয়োজনে যুক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষেদের শিক্ষার্থী উর্মিলা। তিনি বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা যতটা সুন্দর ও গোছানোভাবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপন করে, সেভাবে বোধহয় আর কোনো কিছুই পারে না। এখানে যারাই আসে, তারাই এই দেশকে উৎসবমুখর একটি জনপদ হিসেবে জানে। এটি দেশের ভাবমূর্তির জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার ভালো লাগছে যে এর সঙ্গে এবার আমি নিজেও যুক্ত রয়েছি।’

মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতে উত্তরা থেকে চারুকলা এসেছেন একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আনুশা মাহজাবিন। তিনি বলেন, ‘বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক আচরণ কতটা বিস্তৃত, সেটা বৈশাখের এই উদযাপনে না এলে বোঝা যায় না। মঙ্গল শোভাযাত্রা সত্যিকার অর্থেই চমৎকার একটি আয়োজন। বৈশাখে ফসল তোলার যে আনন্দ, সেটা পাওয়া যায় এই আয়োজনে।’

মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে অবশ্য কট্টর ধর্মপন্থী দলগুলো নিয়মিত আপত্তি জানিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের নানা রকমের হুমকিও দিয়ে আসছে তারা। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চারুকলা অনুষদের একজন শিক্ষক বলেন, ‘এরা সবকিছুতেই আপত্তি তোলে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় আপত্তি থাকবে কেন? এটি আনন্দ আয়োজন। এখানে সবাই অংশগ্রহণ করে। এখানে কেন ধর্মনাশ হবে!’

এদিকে, সার্বজনীন উৎসবের এই আয়োজনে নিরাপত্তার যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল সতর্ক অবস্থায়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে পুরো শোভাযাত্রাটি ঘিরে রেখেছিল বিশেষ সোয়াত বাহিনী। তাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাধারণ সদস্য ছাড়া ছিলেন সাদা পোশাকে থাকা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত