বৃহস্পতিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

রাকসু-চাকসুতেও আওয়াজ উঠেছে নির্বাচনের

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: 

নিউজগার্ডেনবিডিডটকম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হওয়ার পর চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র সংসদের নির্বাচনের আওয়াজ উঠেছে। ছাত্রসংগঠনগুলো দাবি জানাচ্ছে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগও নিয়েছে। কিন্তু অন্য দুটিতে প্রশাসনের তেমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। কিন্তু ওই আদেশ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে পাঁচজন করে নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও নব্বইয়ের দশক থেকে তা বন্ধ আছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছাত্রদের কোনো মতামত দেওয়ার জায়গা নেই।

২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ জন শিক্ষার্থীর করা একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন করতে আদেশ দেন। পরের মাসে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নেয়, ২০১৯ সালের মার্চের মধ্যে এই নির্বাচন হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে ডাকসু নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়। আগামী ১১ মার্চ এই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।

এর আগে সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসু নির্বাচন হয়। একইভাবে ১৯৮৯ সালে রাকসু, ১৯৯০ সালে চাকসু ও ১৯৯২ সালে জাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও তা ভেস্তে যায়। এবার ডাকসু নির্বাচনের বাতাস বইতে শুরু করার পর দাবি উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে চাকসু নির্বাচনের দাবি উঠেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালজুড়ে নির্বাচনের দাবিতে লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কিছু বলা হয়নি। অন্যদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় সভা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে; যদিও মতবিনিময়ের জন্য তারিখ নির্ধারিত হয়নি।

ডাকসু নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরেই
২৮ বছর পর হতে যাওয়া ডাকসু নির্বাচন সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতিমধ্যেই সব ছাত্রসংগঠনের নেতাদের ডেকে আলোচনা, রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ, খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ, গঠনতন্ত্র সংশোধন, আচরণবিধি প্রণয়নে কমিটি ও পরিবেশ পরিষদের সভা করেছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। ডাকসু ভবন ও হল সংসদের কার্যালয়গুলো সংস্কার করা হচ্ছে।

নির্বাচনের জন্য খসড়া আচরণবিধি সংগঠনগুলোর কাছে পাঠিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার কয়েকটি ছাত্রসংগঠন তাদের সংশোধনী প্রস্তাব প্রশাসনের কাছে জমাও দিয়েছে। আগামী মঙ্গলবার হতে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসিক হলের বাইরে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র করা, কারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, কারা পারবেন না ইত্যাদি।

এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার আগে ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থানের দাবি রয়েছে সব কটি ছাত্রসংগঠনের। এই সহাবস্থান কতটুকু করা সম্ভব, কতটুকু আছে, সে বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের সভায় আলোচনা হয়েছে। প্রাধ্যক্ষদের সভায় তারা দাবি করেছে, হলগুলো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যদিও ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সংগঠনগুলোর নেতাদের অভিযোগ, তাঁদের কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবস্থানের জন্য আবাসিক হলে আদর্শ পরিবেশ নেই। এ কারণেই তাঁরা একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র চান।

তবে আবাসিক হলগুলোয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বহিরাগত ও অছাত্রদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছাত্রত্ব শেষ হওয়া ব্যক্তিদের হলছাড়া করতে প্রশাসন কোথাও কোথাও অভিযান শুরু করেছে। এ নিয়ে একাধিকবার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রশাসনের দ্বন্দ্বও হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী  বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা একটা সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে চাই।’

১৯৯০ সালের নির্বাচনের পর ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে তিনবার তফসিল হয়েও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হয়নি। ১৯৯৮ সালে ডাকসুর কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। ওই সময় পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হলেও আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১২ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ, ধর্মঘট, মানববন্ধন, কালো পতাকা মিছিল, ব্যঙ্গচিত্র, উচ্চ আদালতে মামলা, এমনকি অনশন পর্যন্ত হয়েছে।

‘রাকসু নিয়ে মতবিনিময় হবে’
২৪ জানুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলা হয়েছে, রাকসু নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছাত্রসংগঠনসমূহের গঠনতন্ত্র, রেজিস্ট্রেশন এবং পূর্ণাঙ্গ হল কমিটির তালিকা ২৯ জানুয়ারির মধ্যে জমা দিতে হবে। আবাসিক হলের প্রাধ্যক্ষরা এই বিজ্ঞপ্তিতে সই করলেও তাতে বলা হয়েছে, ডাকসু নির্বাচন–সম্পর্কিত মতবিনিময় কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পাঠানো পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমরা ছাত্রসংগঠনগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জানার জন্য গঠনতন্ত্রগুলো দেখব। সংগঠনগুলোর মধ্যে কোনোটি দেশবিরোধী কার্যকলাপ বা জঙ্গিবাদে জড়িত কি না, তা-ও দেখব।’ তিনি জানান, গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করতে কিছুদিন সময় লাগবে। এরপর কবে সংগঠনগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করা হবে, তা জানিয়ে দেওয়া হবে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর কেউ কেউ সমালোচনা করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জি এম জিলানী শুভ বলেন, ‘এটা শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করার একটা পাঁয়তারা বলে মনে করি। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, এখানে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা টেনে আনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেমন আচরণ?’

রাকসু নির্বাচনের দাবিতে ২০১৭ সাল থেকে বিভিন্ন সময় আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধন, মোমবাতি প্রজ্জ্বালন, বিক্ষোভ, গণস্বাক্ষর ও স্মারকলিপির মতো বেশ কয়েক ধাপে সেখানে আন্দোলন হয়েছে।

জাকসুতে এক বছর সময় চাইছে প্রশাসন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯২ সালে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই শিক্ষক ক্লাবে ছাত্ররা শিক্ষকদের ওপর হামলা চালান। এর জের ধরে প্রশাসন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভেঙে দেয়। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি।

২০১৩ সালে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন জাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজকে প্রধান করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। পরবর্তী বছরের জানুয়ারিতে নির্বাচনের তারিখও ঘোষণা করা হয়। ১৯ থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার শ মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের কেউ মনোনয়নপত্র নেননি। মনোনয়নপত্র বিতরণের শেষ দিনে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচন কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ওই সময়  বলেছিলেন, সরকার না চাইলে জাকসু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাকসু নির্বাচনের আয়োজন করা হবে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। কিন্তু এরপর আর কোনো আয়োজন হয়নি। ২০১৭ সালে একাধিকবার জাকসু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু উপাচার্য ফারজানা ইসলাম নির্বাচনের পরিবেশ নেই বলে জানিয়েছিলেন।

এখন ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ার পর জাকসু নির্বাচনের দাবিতে দেয়ালে লেখালেখি করছেন প্রগতিশীল বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নির্বাচনের দাবি উঠেছে। দেয়ালগুলোয় ‘৩ মাসের মধ্যে জাকসু নির্বাচনের তফসিল দাও’, ‘যে ভিসি জাকসু দেয় না, সেই ভিসি চাই না’ ইত্যাদি লেখা দেখা যাচ্ছে।

যোগাযোগ করা হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে জাকসু নির্বাচনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। অন্যগুলোয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক। তারপর আমরা পরিবেশ–পরিস্থিতি বিবেচনা করে আগামী বছর জাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে ভাবব।’

প্রাণহানি হবে না—বন্ডসই দিলে নির্বাচন দেবে চবি প্রশাসন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের সর্বশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। ২৮ বছর আগের সহসভাপতি (ভিপি) মো. নাজিম উদ্দিনকে এখনো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চাকসুর ভিপি হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয় বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

চাকসু নির্বাচনের দাবিতে গত ১০ বছরে বিভিন্ন সময় কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্রসংগঠনগুলো। ২০১৫ সালে খোদ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকেও ডাকসু নির্বাচনসহ আট দফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন শুরুর পর ১৫ জানুয়ারি ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আবারও মানববন্ধন করে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্টসহ অন্য সংগঠনগুলোও ছাত্র সংসদ নির্বাচন চায়।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্য, নির্বাচনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিনষ্ট হবে না, সহিংসতা, সংঘাত, সন্ত্রাস ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে না—ছাত্রসংগঠনগুলো এই নিশ্চয়তা দিয়ে যদি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে, তবেই কর্তৃপক্ষ নির্বাচন দিতে প্রস্তুত।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত